বিএফআইইউ।
বাংলাদেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অর্থ পাচারের সংস্কৃতি বন্ধে এক কঠোর ও নজিরবিহীন নির্দেশ জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এখন থেকে দেশের সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লিখিত অঙ্গীকার করতে হবে। কেবল স্বাক্ষরই নয়, সেই অঙ্গীকারনামা নিজ নিজ অফিসকক্ষে দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে ব্যাংকগুলোতে পাঠানো বিএফআইইউর এই নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ পর্যায়ে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা ফেরানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। গত এক দশকে বিশেষ করে বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক দখল এবং নামে-বেনামে ঋণের আড়ালে যে ভয়াবহ লুটপাট চলেছে, তা রোধে এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি দেওয়াল হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএফআইইউ প্রেরিত নির্ধারিত ফরম্যাটে অঙ্গীকার করতে হবে যে—ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পর্যায়েই তারা ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’ করবেন না, মানবেন না এবং সহ্যও করবেন না। এছাড়া নীতিমালার বাইরে কোনো ঋণ অনুমোদন না করা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিষয়টিও এই ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে জানা গেছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের জন্য আলাদা একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্টিং এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের (পিইপি) ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। নতুন নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই হলফনামায় স্বাক্ষর করা এখন থেকে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণ্য হবে।
বিএফআইইউর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অংকের ঋণ জালিয়াতি ও আর্থিক অপরাধের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে করপোরেট গভর্ন্যান্স বা সুশাসন প্রায় ভেঙে পড়েছে। এই অঙ্গীকারনামা কেবল একটি কাগজ নয়, বরং এটি শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর একটি স্থায়ী নৈতিক চাপ তৈরি করবে।"
বিএফআইইউর এই নতুন নির্দেশনায় সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও আশার আলো রয়েছে। কোনো গ্রাহক ব্যাংকিং সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হলে এখন থেকে সরাসরি বিএফআইইউর কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর কার্যকারিতা নিয়ে কিছুটা সতর্ক। তাদের মতে, কেবল দেয়ালে অঙ্গীকারনামা টাঙিয়ে রাখলেই জালিয়াতি বন্ধ হবে না; এর পাশাপাশি বিএফআইইউ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত তদারকি এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো পদক্ষেপ যেখানে শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সরাসরি নৈতিক জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। এখন দেখার বিষয়, এই দেয়ালপত্রগুলো ব্যাংকের অন্দরে লুকিয়ে থাকা অনিয়মের অন্ধকার কতটুকু দূর করতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
