ইউরোপীয় দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বৈশ্বিক এভিয়েশন জায়ান্ট ‘এয়ারবাস’ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে নীতিগত আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর, তীব্র কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের মুখে এবার ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম ‘এয়ারবাস’ কেনার বিষয়েও আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে সরকার। আজ বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) চার প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দলের এক হাই-প্রোফাইল বৈঠক শেষে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। সরকারের এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণে মার্কিন ও ইউরোপীয় লবির মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাহেঁচড়া এক নতুন মোড় নিল।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ সার্ক সেরে শার্লে, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সারাহ কুক, স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল সিস্তিয়াগা, জার্মান দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স আনজা টারস্টেন এবং ইইউ মিশনের ডেপুটি মিশন চিফ বাইবা জেরিন অংশ নেন। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে বিমানের বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এয়ারবাস যুক্তকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দেশীয় স্বার্থ বজায় রেখে একটি ‘টেকসই মিক্সড ফ্লিট’ বা মিশ্র বিমানবহর তৈরির ক্ষেত্রে এয়ারবাস ক্রয়ের বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেছেন।
বিমানের নিজস্ব বাণিজ্যিক মূল্যায়ন ছাড়া কেবল নানামুখী কূটনৈতিক ‘চাপে’ একের পর এক কোটি কোটি ডলারের উড়োজাহাজ কেনার এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে ইতিমধ্যেই তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমানের বর্তমান ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে ১৪টিই মার্কিন বোয়িং কোম্পানির এবং বাকি ৫টি স্বল্প দূরত্বের ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফট। এমতাবস্থায় কোনো সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ছাড়া এয়ারবাস যুক্ত করে হুট করে ‘মিশ্র বহর’ তৈরি করলে রক্ষণাবেক্ষণ, পার্টস সোর্সিং ও পাইলট প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বিমান বড় ধরনের আর্থিক লোকসান ও ব্যবস্থাপনার সংকটে পড়তে পারে।
পর্দার আড়ালের এই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর ঢাকা সফরের সময় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনের ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের চাপের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান বিএনপি সরকার সিয়াটলের বোয়িংয়ের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু গত ৪ নভেম্বর ফ্রান্স দূতাবাসে ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের যৌথ সংবাদ সম্মেলন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের মতো বাণিজ্যিক কার্ড ব্যবহারের পর শেষ পর্যন্ত এয়ারবাসের কর্মকর্তারা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সফল দৌড়ঝাঁপ সম্পন্ন করতে সক্ষম হলেন।
ইউরোপীয় প্রতিনিধি দল সরকারের এই নতুন আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে সব ধরনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তবে মার্কিন জায়ান্ট বোয়িংয়ের সঙ্গে গত ৩০ এপ্রিল স্বাক্ষরিত ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের ক্রয় চুক্তির বাধ্যবাধকতা বজায় রেখে, ঋণে জর্জরিত বাংলাদেশ বিমান কীভাবে সমান্তরালভাবে ইউরোপীয় এয়ারবাসের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন নিশ্চিত করবে এবং এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করবে—তা এখন দেশের অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতির জন্য এক বিশাল পরীক্ষা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
