টরন্টোর স্টেডিয়ামে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচের ৭৮ মিনিটে সমতাসূচক গোলটি করার পর সতীর্থদের সাথে ঐতিহাসিক উল্লাসে মাতছেন কানাডার ফরোয়ার্ড কাইল লারিন। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ চার দশকের অপেক্ষা, টানা আটটি পরাজয়ের গ্লানি এবং একটি জাতির ফুটবলীয় স্বপ্ন— সবকিছুর অবসান ঘটল এক মহাকাব্যিক রাতে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের তৃতীয় আসরে এসে ইতিহাসের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেছে কানাডা। আজ টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বের এক শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সাথে ১-১ গোলে ড্র করে এই ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করে ম্যাপেল লিফের দেশটি। ম্যাচের ২১ মিনিটে জোভো লুকিচের হেডে বসনিয়া এগিয়ে গেলেও, ৭৮ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় কাইল লারিনের চোখধাঁধানো সমতাসূচক গোল কানাডাকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত এই পয়েন্ট।
ম্যাচের ঘড়িতে তখন ৭৮ মিনিট। টরন্টো স্টেডিয়ামের গ্যালারি রূপ নিয়েছিল এক উত্তাল লাল সমুদ্রে। আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ম্যাচ যখন টানটান উত্তেজনায় ভরপুর, ঠিক তখনই স্পটলাইটে আসেন বদলি হিসেবে মাঠে নামা ফরোয়ার্ড কাইল লারিন। বক্সের ঠিক কিনারে সতীর্থ প্রমিজ ডেভিডের একটি চতুর ফ্লিক পাস পান তিনি। নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে বল নিজের হোল্ডে নিয়ে শরীরটাকে ঝটকা বাঁকে ঘোরালেন লারিন। বসনিয়ান ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে তাঁর নেওয়া নিচু, মাপা শটটি পোস্টের কোণ ঘেঁষে সোজা জালে জড়ায়। পুরো স্টেডিয়াম যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, আর পরের মুহূর্তেই মেতে ওঠে গগনবিদারী উল্লাসে। এই একটি গোল শুধু ম্যাচের সমতাই ফেরায়নি, বরং কানাডার ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
সুযোগ নষ্টের প্রথমার্ধ ও বসনিয়ার আকস্মিক আঘাত
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসেছিল স্বাগতিক কানাডা। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিনিশিংয়ের চিরচেনা দুর্বলতা আবারও প্রথমার্ধে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ম্যাচের ১৭ মিনিটে সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন জোনাথান ডেভিড। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেদ করে বসনিয়ান গোলরক্ষককে একেবারে একা পেয়েও তিনি বল মারেন সোজা তাঁর গায়ে।
ঐতিহাসিক এই সুযোগ নষ্টের খেসারত কানাডাকে দিতে হয় ঠিক চার মিনিট পরেই। ২১ মিনিটে কর্নার পায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। ইভান বাসিকের নেওয়া বিপজ্জনক কর্নার কিকটি জটলার মধ্যে সিয়াদ কোলাসিনাচের মাথায় লেগে ফ্লিক হয়। সেখানে আনমার্কড অবস্থায় থাকা বসনিয়ান স্ট্রাইকার জোভো লুকিচ এক দুর্দান্ত হেডে কানাডার গোলরক্ষক ক্রেপোকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম গোলেই স্বাগতিক দর্শকদের স্তব্ধ করে বসনিয়াকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন লুকিচ। পিছিয়ে পড়ে কানাডা গোল পরিশোধে মরিয়া হয়ে উঠলেও ৩২ মিনিটে তানি ওলুয়াসেয়ির শট বারের ওপর দিয়ে চলে গেলে প্রথমার্ধ পিছিয়েই শেষ করতে হয় স্বাগতিকদের।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার আরও বাড়ায় কানাডা। কোচ জেস মার্শের কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের গতি পাল্টে দেয়। ৫৩ মিনিটে মাঝমাঠের চালিকাশক্তি ইউস্তাকিওর বাড়ানো এক ডিফেন্স-চেরা পাস ধরে গোলরক্ষককে প্রায় পরাস্ত করেছিলেন লারেয়া। তাঁর নেওয়া শটটি যখন নিশ্চিত গোলের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বসনিয়ার অধিনায়ক সিয়াদ কোলাসিনাচ অবিশ্বাস্য এক ডাইভিং ব্লকে নিজের শরীর ছুঁড়ে দেন। বলটি তাঁর গায়ে লেগে ক্রসবারে লেগে ফিরে আসলে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় কানাডা। পুরো স্টেডিয়াম তখন হতাশায় মাথায় হাত দেয়।
ম্যাচের ৬০ মিনিটে কোচ জেস মার্শ একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন এনে দলে গতি বাড়ান। মাঠে নামানো হয় প্রমিজ ডেভিড ও আলী আহমেদকে। এরপর ৭৫ মিনিটে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে কাইল লারিনকে মাঠে নামান কোচ, যা শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
৭৮ মিনিটে লারিনের গোলের পর ম্যাচ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে লড়ে। ইনজুরি টাইমে কাইল লারিন তাঁর দ্বিতীয় গোলটি পেয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু বসনিয়ার তারিক মুহারেমোভিচ ষষ্ঠ গজের ভেতর থেকে আত্মঘাতী স্লাইডিং ব্লকে বল ক্লিয়ার করেন। ফলে ১-১ গোলের সমতা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় দুই দলকে।
ইতিহাসের পাতায় এক নতুন কানাডা
১৯৮৬ এবং ২০২২— পূর্ববর্তী দুটি বিশ্বকাপে মোট ছয়টি ম্যাচ খেলে সবকটিতেই হেরেছিল কানাডা। কোনো পয়েন্ট বা ড্রয়ের স্বাদ তারা এর আগে পায়নি। দলনেতা ও পোস্টার বয় আলফোনসো ডেভিসের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও দলের এই ঘুরে দাঁড়ানো কানাডিয়ান ফুটবলের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দেয়। এই ১ পয়েন্টের ব্যবধানে দীর্ঘ ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গ্রুপ পর্বের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল ম্যাপেল লিফেরা। অন্যদিকে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে মূল্যবান ১ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছেড়েছে।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোরলাইন:
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
