মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার হালিস্কো স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে সমতাসূচক গোল করে ফরাসি অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি। ব্রাজিলকে পেনাল্টি শুটআউটে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স, ২১ জুন, ১৯৮৬। ফাইল ছবি
চার বছর আগে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল প্যারিসের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের অভিবাসী প্রধান শহরতলি বঁদির কিশোর-তরুণরা। ফরাসি সমাজের মূল স্রোত থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এই ‘বাঁলিয়ু’ বা অবহেলিত উপশহরগুলোর মানুষের কাছে ফুটবল কেবল খেলা নয়, এটি অস্তিত্বের লড়াই ও নিজেদের ফরাসি প্রমাণ করার প্রধান মঞ্চ। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বঁদি কিংবা সার্সেলের মতো কংক্রিটের জঙ্গলগুলোতে আবারও ধুয়ে শুকাতে দেওয়া হয়েছে নীল জার্সিগুলো। প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশমের ঘোষিত ২৬ সদস্যের বিশ্বসেরা স্কোয়াডে এই গলির ধুলোবালি থেকে উঠে আসা প্রতিনিধিরাই এখন ফরাসিদের ট্রফি পুনরুদ্ধারের মূল ভরসা।
ফরাসি ফুটবলের শেকড় প্রোথিত এক নিরেট বিশ্বাসে—‘আমরা জিততে পারি’। ১৯৫৮ সালে জাস্ট ফঁতেনের এক বিশ্বকাপে ১৩ গোলের অস্পৃশ্য রেকর্ড কিংবা আশির দশকে মিশেল প্লাতিনির ফুটবলীয় শিল্পকলা সেই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল। তবে ১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদান, মার্সেইয়ের লা কাস্তেল্লান শহরতলির আলজেরিয়ান অভিবাসী পরিবারের সন্তান, যখন জোড়া হেডে ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দিলেন, তখনই জন্ম নেয় বহু সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়া দল ‘ব্ল্যাক, ব্লাঙ্ক, ব্যুর’ (কালো, সাদা ও আরব)। কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি বলেছিলেন, “আমি তখন তরুণ, বুঝিনি কী হচ্ছে। শুধু দেখলাম দেশম কাপটা তুলছেন আর পুরো স্টেডিয়াম নীল হয়ে গেছে।”
২০০৬ সালে বার্লিনের ফাইনালে ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে জিনেদিন জিদানের সেই ঐতিহাসিক ঢুঁ (হেডবাট) এবং ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ার বিষাদময় বিদায়ের পর, ফ্রান্স দ্বিতীয় সূর্যোদয় দেখে ২০১৮ সালে। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফ্রান্স যখন দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন ফরাসি ফুটবলের রাজপুত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে বঁদির ১৯ বছর বয়সি কিশোর কিলিয়ান এমবাপ্পের। ২০২২ সালের লুসাইল ফাইনালে এমবাপ্পের অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক সত্ত্বেও টাইব্রেকারের ভাগ্য ট্রফি তুলে দেয় লিওনেল মেসির হাতে, যা বাঁলিয়ুর অলিগলিতে এক দীর্ঘশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপে সেই অধরা ট্রফি ফিরে পেতে রিয়াল মাদ্রিদের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পেই থাকছেন আক্রমণের মূল নেতৃত্বে। উইংয়ে তার সঙ্গী হিসেবে থাকবেন ব্যালন ডি'অর জয়ী উসমান দেম্বেলে এবং বায়ার্ন মিউনিখের অন্যতম সেরা লেফট-ফুটেড উইঙ্গার মাইকেল অলিসা। এছাড়া পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ মাতানো ব্র্যাডলি বার্কোলা ও ম্যানচেস্টার সিটিতে শানিত হওয়া রায়ান শেরকি ফরাসি আক্রমণভাগকে বিশ্বসেরা করে তুলেছে। রক্ষণভাগে আর্সেনালের উইলিয়াম সালিবা, বায়ার্নের দায়ো উপামেকানো এবং লিভারপুলের ইব্রাহিমা কোনাটের মতো আফ্রিকান শেকড় থেকে আসা তারকারাই দলের মূল প্রাচীর, আর গোলবারে হুগো লরিসের অবসরের পর এক নম্বর পজিশন সামলাবেন এসি মিলানের মাইক মেনিওঁ।
তবে অঁতোয়ান গ্রিজমানের আন্তর্জাতিক অবসর এবং রিয়াল মাদ্রিদের এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার বাদ পড়া ফরাসি মাঝমাঠে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। রিয়াল মাদ্রিদের অরেলিয়া চুয়ামেনি এবং আদ্রিয়েন রাবিওর সাথে মাঝমাঠ সামলাবেন পিএসজির ২০ বছর বয়সি তরুণ ওয়ারেন জাইর-এমেরি এবং ৩৫ বছর বয়সি অভিজ্ঞ এনগোলো কান্তে। গ্রিজমানের মতো ‘গেম মেকার’-এর অভাব এবং কোচ দেশমের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশল ফ্রান্সের প্রধান দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দলের ভেতরের ইগোর লড়াই ও ড্রেসিংরুমের শৃঙ্খলা রক্ষা করাই হবে কড়া শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত দিদিয়ের দেশমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
গ্রুপ 'আই'-তে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ সেনেগাল, ইরাক এবং নরওয়ে, খাতা-কলমে ফরাসিদের জন্য নকআউট পর্বের টিকিট পাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত। ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে যে সোনালি যাত্রার শুরু করেছিলেন, ২০২৬ সালে কোচ হিসেবে সেটির সফল সমাপ্তি টেনে ড্রেসিংরুম ছাড়তে চান দিদিয়ের দেশম। উত্তর আমেরিকার মাঠে যখন এই গ্রীষ্মে ‘লে ব্লু’রা নামবে, বঁদির অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের জানালাগুলো খুলে যাবে এই বিশ্বাসে—মাঠের ছাব্বিশ জন আসলে প্যারিসের অভিজাত বুলেভার্ডের নয়, বরং তাদেরই প্রতিনিধি।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
