পবিত্র কাবার চারদিকে তাওয়াফরত লাখো মুসলিম উম্মাহ।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক—সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে পবিত্র হজের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিশ্বের লাখো মুসলমান, যার মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের হজযাত্রীরাও। হজের মতো একটি দীর্ঘ ও কায়িক পরিশ্রমসাধ্য ইবাদত সুচারুরূপে সম্পাদনের জন্য আইনি ও স্বাস্থ্যগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি হজের নিখুঁত নিয়মকানুন জানা এবং জরুরি সামগ্রী সঙ্গে রাখা আবশ্যক। একই সঙ্গে মক্কা-মদিনার পবিত্র স্থানগুলোতে কোন কোন আমলে হজের ফরজ ও ওয়াজিব আদায় হয় এবং কোথায় দুআ দ্রুত কবুল হয়, তা জানা থাকলে এই আত্মিক সফর সহজ ও ত্রুটিমুক্ত হয়।
হজযাত্রার প্রাথমিক ধাপে সরকারি বা বেসরকারি মাধ্যমে প্রাক-নিবন্ধন, পাসপোর্ট তৈরি, হজের টাকা জমা ও বিমানের টিকিট নিশ্চিত করার মতো কাজগুলো করতে হয়। এরপরই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব—টিকা দেওয়া এবং অনুমোদিত চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ সংগ্রহ করা। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ও সৌদি আরবের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এই স্বাস্থ্যগত প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।
হজের নিয়মকানুন ও পরিভাষাগুলো বিস্তারিত জানতে একাধিক নির্ভরযোগ্য বই পড়া কিংবা বিশ্বস্ত ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেম ও পূর্বে হজ সম্পন্ন করেছেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করা উত্তম।
সৌদি আরবে অবস্থানকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র সুনির্দিষ্ট ব্যাগে গোছানো উচিত। মালপত্র বহনের ব্যাগের ওপর স্পষ্ট অক্ষরে ইংরেজিতে নিজের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ও পাসপোর্ট নম্বর লিখে রাখা বাধ্যতামূলক।
নথিপত্র ও অর্থ
বিমানের টিকিট, পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র এবং সৌদি রিয়াল বা ডলার। এগুলো নিরাপদে রাখার জন্য গলায় ঝোলানো ছোট ব্যাগ ব্যবহার করা সুবিধাজনক। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য কিছু বাংলাদেশি টাকাও আলাদা রাখতে হবে।
ইহরামের কাপড়
পুরুষদের জন্য কমপক্ষে দুই সেট সাদা সুতি ইহরামের কাপড় (আড়াই হাত বহরের আড়াই গজের এক টুকরো এবং তিন গজের এক টুকরো)। নারীদের জন্য সেলাইযুক্ত স্বাভাবিক শালীন পোশাকই ইহরামের কাপড়।
পাদুকা ও আনুষঙ্গিক
দীর্ঘ হাঁটার জন্য নরম ফিতাওয়ালা স্যান্ডেল। ইহরামের কাপড় আটকে রাখার জন্য বেল্ট। এ ছাড়া গামছা, তোয়ালে, লুঙ্গি, গেঞ্জি, পায়জামা ও পাঞ্জাবি।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা
সুগন্ধিহীন সাবান, পেস্ট, ব্রাশ, মিসওয়াক, নখ কাটার যন্ত্র ও সুই-সুতা।
ধর্মীয় সামগ্রী
হজের নির্দেশিকা বই, পকেট কোরআন শরিফ ও প্রয়োজনীয় ধর্মীয় পুস্তক।
চিকিৎসা ও অন্যান্য
চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রসহ (প্রেসক্রিপশন) নিয়মিত ও জরুরি ওষুধ। চশমা ব্যবহারকারীদের জন্য অতিরিক্ত একটি চশমা রাখা নিরাপদ। মদিনার আবহাওয়ার জন্য হালকা শীতের কাপড় এবং ঘরে পরার মতো আরামদায়ক পোশাক। যোগাযোগ সচল রাখতে একটি ভালো মোবাইল সেট, তবে সৌদি আরবে পৌঁছে সেখানকার সিম কার্ড সংগ্রহ করে নিতে হবে।
হজের রীতিনীতি সঠিকভাবে পালনের জন্য এর মৌলিক পরিভাষাগুলোর স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন:
| পরিভাষা | অর্থ ও তাৎপর্য |
| ইহরাম | হজ বা ওমরার নিয়ত করে তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু হালাল কাজ নিজের ওপর হারাম করা। |
| তালবিয়া | ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’ এই পবিত্র ঘোষণা পাঠ করা। |
| মীকাত | মক্কাগামী যাত্রীদের জন্য ইহরাম ছাড়া অতিক্রম করা নিষিদ্ধ এমন ভৌগোলিক সীমানা। |
| হেরেম | মসজিদে হারামের চারদিকের নির্দিষ্ট পবিত্র এলাকা, যেখানে শিকার, যুদ্ধ বা গাছ কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। |
| তাওয়াফ | হাজরে আসওয়াদের কোণ থেকে শুরু করে কাবা ঘরকে বামে রেখে বিশেষ নিয়মে সাতবার চক্কর দেওয়া। |
| সাঈ | সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে নির্দিষ্ট নিয়মে সাতবার যাতায়াত করা। |
| দম ও বাদানা | হজের কোনো ওয়াজিব বা ইহরামের নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পশু কোরবানি দেওয়া। |
একনজরে তামাত্তু হজের ধারাবাহিক আমল
১. ওমরার ইহরাম
যাত্রার আগে নখ-চুল কেটে, গোসল সেরে পুরুষরা ইহরামের কাপড় পরে দুই রাকাত মুস্তাহাব নামাজ পড়বেন। এরপর ওমরার নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করবেন। নারীরা স্বাভাবিক পোশাকে মুখে ক্যাপ-বিশিষ্ট নেকাব (যা মুখ স্পর্শ করবে না) ব্যবহার করবেন।
২. মক্কায় প্রবেশ ও ওমরাহ
মক্কায় পৌঁছে ওজুসহকারে তাওয়াফ শুরু করবেন। তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে পুরুষদের ‘রমল’ (বীরদর্পে দ্রুত হাঁটা) এবং পুরো তাওয়াফে ‘ইযতিবা’ (ডান বগল খালি রেখে বাম কাঁধে চাদর রাখা) করা সুন্নত। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়ে জমজমের পানি পান করবেন এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাঈ করবেন। এরপর চুল কেটে ইহরাম ভঙ্গ করে হালাল হবেন।
৩. হজের ইহরাম ও মিনা (৮ জিলহজ)
৮ই জিলহজ পুনরায় হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে মিনায় রওনা হবেন। সেখানে জোহর থেকে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ও রাতযাপন করা সুন্নত।
৪. আরাফাত ও মুজদালিফা (৯ জিলহজ)
৯ই জিলহজ সূর্যোদয়ের পর আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হবেন। দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ময়দানে অবস্থান করা হজের মূল ফরজ (উকুফে আরাফা)। সূর্যাস্তের পর নামাজ না পড়ে মুজদালিফার দিকে রওনা হতে হবে এবং সেখানে গিয়ে এশার ওয়াক্তে মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তে হবে। মুজদালিফায় রাতযাপন করা সুন্নত এবং ১০ই জিলহজ সুবহে সাদিকের পর উকুফে মুজদালিফা করা ওয়াজিব।
৫. কংকর নিক্ষেপ, কোরবানি ও হলক (১০ জিলহজ)
১০ই জিলহজ সকালে মিনায় ফিরে বড় জামরায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ (ওয়াজিব) করতে হবে। কংকর মারার পর প্রথম কাজ হলো হজের ওয়াজিব কোরবানি (দমে শোকর) দেওয়া। এরপর মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটার (ওয়াজিব) পর ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করে স্বাভাবিক পোশাক পরা যাবে।
৬. তাওয়াফে জিয়ারত ও বিদায় (১০-১২ জিলহজ)
এই দিনগুলোর মধ্যে কাবার মূল ফরজ তাওয়াফ (তাওয়াফে জিয়ারত) ও হজের সাঈ সম্পন্ন করতে হবে। ১১ ও ১২ই জিলহজ দুপুরে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর মিনার তিনটি জামরাতেই ৭টি করে মোট ২১টি কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। সবশেষে মক্কা ত্যাগের আগে মীকাতের বাইরের হাজিদের জন্য একটি বিদায়ী তাওয়াফ (তাওয়াফে বিদা) করা ওয়াজিব।
দুআ কবুলের বিশেষ স্থান ও জরুরি দুআসমূহ
পবিত্র সফরে প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান হলেও কিছু নির্দিষ্ট স্থানে দুআ নিশ্চিতভাবে কবুল হয় বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। এর মধ্যে উমরাহর নিয়ত করার পর, প্রথমবার কাবা শরিফ দেখার সময়, তাওয়াফ ও সাঈ করার সময়, মুলতাজাম (কাবা শরিফের দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী দেয়াল), সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের ওপর এবং সবুজ বাতি চিহ্নিত স্থানে দুআ দ্রুত কবুল হয়।
বিশেষ করে ৯ই জিলহজ আরাফাতের ময়দানে হাত তুলে পরম বিশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও কল্যাণ চাইতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আরাফাতের দিনের সেরা দুআ হলো, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বদির।"
দৈনন্দিন জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুআ
ঘর থেকে বের হওয়ার দুআ
بِسْمِ اللهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ (বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।)
শারীরিক সুস্থতার দুআ
اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَدَنِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي سَمْعِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَصَرِي، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ (আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাদানি, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি সাময়ি, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাসারি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা।)
ঋণ ও দুশ্চিন্তা মুক্তির দুআ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ... (আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি...)
হজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়, এটি একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। সঠিক নিয়মকানুন মেনে, ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিয়ে এবং খাঁটি নিয়তে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিলে তবেই সেই হজ ‘হজে মাবরুর’ বা মকবুল হজে পরিণত হয়। যাত্রার আগের প্রতিটি মুহূর্তকে অবহেলা না করে সঠিক প্রস্তুতি ও সঠিক দুআ আয়ত্ত করার মাধ্যমেই এই পবিত্র সফরের সর্বোচ্চ সুফল লাভ সম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
