পশ্চিম আকাশে এক ফালি রুপালি রেখা—অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বয়ে আনল অনাবিল প্রশান্তি। শুক্রবার সন্ধ্যায় শাওয়ালের চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গেই স্পন্দিত হয়ে ওঠে কোটি প্রাণ, ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয় সেই কালজয়ী সুর—‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা ও আত্মশুদ্ধির কঠোর প্রহর পেরিয়ে আজ শনিবার সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর।
রমজানজুড়ে যে সংযম, ধৈর্য এবং ত্যাগের শিক্ষা মানুষ অর্জন করেছে, ঈদুল ফিতর সেই মানবিক বোধকে সামষ্টিক উদযাপনে রূপ দেওয়ার দিন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভবের মধ্য দিয়ে বিত্তহীনদের প্রতি সহমর্মী হওয়ার যে নিরন্তর অনুশীলন চলেছে মাসব্যাপী, আজ তার পূর্ণতা পাওয়ার ক্ষণ। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ‘ফিতরা’ প্রদানের মাধ্যমে সমাজের প্রান্তিক মানুষের উৎসব নিশ্চিত করার এই সংস্কৃতি ইসলামের শাশ্বত সাম্যবাদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। উৎসব এখানে কেবল ব্যক্তিগত আমোদ নয়, বরং ভ্রাতৃত্বের এক সুদৃঢ় সেতুবন্ধ।
গত কয়েক দিন ধরে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন আর লঞ্চঘাটগুলোতে ছিল জনস্রোত। প্রচণ্ড দাবদাহ, অসহনীয় যানজট আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি আজ তুচ্ছ হয়ে গেছে প্রিয়জনের সান্নিধ্যে। নাড়ির টানে ঘরে ফেরা সেই অজস্র মানুষের পদচারণায় মুখরিত এখন গ্রামবাংলার মেঠোপথ থেকে শুরু করে চিরচেনা আঙিনা। মা-বাবার মমতামাখা হাসি আর স্বজনদের আলিঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে পথের সব যাতনা। এই মিলনমেলাই জানান দিচ্ছে—উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে শেকড়ের টানে।
রাজধানী থেকে প্রান্তিক জনপদ—সবখানেই এখন সাজ সাজ রব। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত বিপণিবিতানগুলোতে ছিল আতর, টুপি আর ঈদসামগ্রী কেনার ভিড়। গৃহকোণে গৃহিণীদের নিপুণ ছোঁয়ায় চলছে রান্নাবান্নার শেষ প্রস্তুতি। বিশেষ করে তরুণীদের হাতে মেহেদির আলপনা আর বিউটি পারলারগুলোর দীর্ঘ সারি উৎসবের রংকে আরও গাঢ় করে তুলেছে। দেশের নানা প্রান্তে আয়োজিত ঈদমেলাগুলো গ্রামীণ জনপদে তৈরি করেছে এক রঙিন আবহ।
আজকের দিনের প্রধান আকর্ষণ ঈদের জামাত। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, দেশের প্রধান ঈদ জামাত সকাল সাড়ে আটটায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে। ইমামতি করবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি হলে বিকল্প হিসেবে সকাল নয়টায় বায়তুল মোকাররমে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্যানুযায়ী, জাতীয় ঈদগাহে এবার প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির জন্য নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে নারীদের জন্য রয়েছে পৃথক অন্দরমহল। এছাড়া বায়তুল মোকাররমে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
নামাজ শেষে চিরচেনা দৃশ্যে মেতে উঠবেন সবাই—কোলাকুলি আর ‘ঈদ মোবারক’ বিনিময়ে ঘুচে যাবে সব দূরত্ব। অশ্রুসিক্ত নয়নে অনেকে সমবেত হবেন প্রিয়জনদের কবরের পাশে, প্রার্থনা করবেন বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায়। দিনভর চলবে আতিথেয়তা, আড্ডা আর ভ্রমণের আনন্দ।
পবিত্র ঈদ উপলক্ষে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তাঁরা একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করলেও, উৎসবের সর্বজনীন আবেদন তাকে ছাপিয়ে গেছে। তবে এই আনন্দের অবারিত ধারায় যেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা বিস্মৃত না হয়, সেই উদাত্ত আহ্বান উঠে এসেছে নাগরিক সমাজ থেকে।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমিয় বাণীই আজ প্রতিটি হৃদয়ের প্রতিধ্বনি—
‘তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ...’
আজকের এই পবিত্র দিন কেবল আনুষ্ঠানিকতার নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের অঙ্গীকার গ্রহণের। সবার জীবনে এই ঈদ বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি।
বিষয় : রমজান ঈদ ঈদ আনন্দ ঈদুল ফিতর ২০২৬
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
