ইসলামের প্রধান পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজার গুরুত্ব অপরিসীম |
ইসলামি শরিয়তের অপরিহার্য বিধান এবং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয় পবিত্র রমজান। তবে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর ওপর ৩০টি রোজা পালনের এই বাধ্যবাধকতা ইসলামের একেবারে সূচনা পর্বে এমন ছিল না। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে পবিত্র কোরআনের ঐশী বাণীর মাধ্যমে সিয়াম সাধনা মুসলিমদের জন্য ‘ফরজ’ বা আবশ্যকীয় কর্তব্য হিসেবে নির্ধারিত হয়। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হিসেবে রোজা কীভাবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে বিধিবদ্ধ হলো, তার ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও হৃদয়স্পর্শী।
সিয়াম বা রোজা রাখার রীতি মানব ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিধান নয়। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রোজা পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ওপরেও ফরজ ছিল। ইতিহাসবিদ ও ধর্মতত্ত্ববিদদের মতে, আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর সময় থেকেই মাসে তিনদিন (আইয়ামুল বিজ) রোজা রাখার প্রথা ছিল। এছাড়া হজরত মুসা (আ.) তূর পাহাড়ে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। ইহুদি ও খ্রিষ্টানসহ প্রাচীন সেমেটিক জাতিগুলোর মধ্যেও ভিন্ন আঙ্গিকে সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকার ধর্মীয় রীতি প্রচলিত ছিল।
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা.) লক্ষ্য করলেন, মদিনার বাসিন্দারা বিশেষ করে ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে (আশুরার দিন) রোজা রাখছেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা জানান, এই দিনে আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন নবী করিম (সা.) বলেন, "মুসা (আ.)-এর আদর্শ পালনে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।" এরপর তিনি সাহাবীদের আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দেন। তবে তখন পর্যন্ত এটি ফরজ বা বাধ্যতামূলক ছিল না।
ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতে, হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) রমজান মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখার চূড়ান্ত আদেশ নাজিল হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলমের মতে, মক্কায় নাজিল হওয়া আয়াতগুলোতে ঈমান ও আকিদার ওপর জোর দেওয়া হলেও মদিনায় ইসলামের প্রায়োগিক বিধিবিধানগুলো প্রবর্তিত হয়, যার অন্যতম ছিল রমজানের রোজা।
তবে শুরুর দিকে এই নিয়মটি ছিল অত্যন্ত শিথিল ও সহজতর। প্রারম্ভিক পর্যায়ে কেউ রোজা রাখতে অপরাগ হলে তার বিনিময়ে 'ফিদইয়া' বা দরিদ্রকে অন্নদানের সুযোগ ছিল। পরবর্তীতে সবার জন্য রোজা পালন বাধ্যতামূলক করা হয়।
বর্তমান যুগে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা পালনের যে নিয়ম আমরা দেখি, শুরুর দিকে তা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। প্রাথমিক অবস্থায় ইফতারের পর থেকে এশার আজান পর্যন্ত পানাহারের সুযোগ ছিল, এশার পর ঘুমিয়ে পড়লে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কিছু খাওয়া যেত না। পরবর্তীতে সাহাবীদের শারীরিক কষ্ট ও মানবিক দিক বিবেচনা করে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল করে সেহরি ও ইফতারের সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করে দেন। এর মাধ্যমেই পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় আধুনিক সিয়াম সাধনার পদ্ধতি।
ইতিহাসবিদেরা জানান, সেই যুগে মদিনার সাহাবীদের সেহরি ও ইফতার ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। খেজুর, জমজমের পানি, উট বা দুম্বার দুধ এবং কখনো সামান্য মাংস দিয়েই সম্পন্ন হতো তাঁদের সিয়াম পালনের আহার। খাবারের প্রাচুর্য না থাকলেও সেই আহারের মধ্যে ছিল অকৃত্রিম আধ্যাত্মিক তৃপ্তি। হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের সেই প্রবর্তিত বিধান আজও অপরিবর্তিত রূপে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম হৃদয়ে বিশ্বাসের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
