নির্দলীয় প্রতীকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনে বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে।
বিতর্কিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক জটিলতা এড়িয়ে আগামী আগস্টে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। যেখানে প্রার্থী হওয়ার আইনি যোগ্যতা থাকলে যে কারো অংশ নেওয়ার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) বুধবার নির্দলীয় প্রতীকে এই নির্বাচন আয়োজনের বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে।
২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের চালু করা দলীয় প্রতীকের ব্যবস্থা বাতিল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের বিল পাস হয়। নতুন এই আইন বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধন করেছে ইসি।
প্রাথমিক খসড়ায় নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকার অঙ্গীকারনামার প্রস্তাব করা হলেও, চূড়ান্ত বিধিমালায় তা বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগসহ যেকোনো দলের কর্মী-সমর্থকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের পর পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিধিমালাতেও একই যোগ্যতা বহাল রাখা হবে। আগস্টেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের শীর্ষ মহল থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, স্থানীয় নির্বাচনে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হবে না।
"আমরা দেখব না সে কোন দল করে। যদি সে ওই পদে নির্বাচনের যোগ্যতা অর্জন করে, তাহলেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এমনকি তিনি হিন্দু না মুসলমান, ছেলে না মেয়ে, কোন দল করেন নাকি করেন না—সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়।"
— আব্দুর রহমানেল মাছউদ, সভাপতি, বিধিমালা প্রণয়ন কমিটি ও নির্বাচন কমিশনার
একই সুর শোনা গেছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কণ্ঠেও। মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, "একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগের হয়েও নির্দলীয় থাকেন তাও পারবেন। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়, এখানে কেউই দলের কথা বলবেন না।"
নিবন্ধন স্থগিত থাকার কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা আওয়ামী লীগ এই স্থানীয় নির্বাচনকে রাজনীতিতে ফেরার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। আত্মগোপনে থাকা দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই তৃণমূলকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
"আমাদের দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন তারা যেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেন। কর্মী-সমর্থকদের মধ্য থেকে এই নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি আছে। অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলোর সাথেও আমাদের আলাপ-আলোচনা চলছে।"
— আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ
নতুন আচরণবিধিতে শুধু রাজনৈতিক অংশীদারিত্বই নয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, নতুন বিধিমালায় প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিধানটি বাতিল করা হয়েছে।
একই সাথে, এবারের নির্বাচনে কোনো ধরনের ডিজিটাল ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হবে না এবং পোস্টাল ব্যালটের সুযোগও থাকছে না। এমনকি পরিবেশ রক্ষা ও ব্যয় সংকোচনে নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই খসড়াটি দ্রুতই রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, "স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার বিষয়টি আমাদের প্রস্তাবনাতেই ছিল। সেটিই আইন আকারে পাস হওয়ার পর এখন বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।"
তফসিল ঘোষণা না হলেও মাঠপর্যায়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছেন। তবে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির পর এই নির্বাচনের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, "জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা তাদের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারেনি। এবার তারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। এতে ভোটের হিসাব-নিকাশ বদলে যাবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "স্থানীয় সরকার নির্বাচন কাগজে-কলমে নির্দলীয় হলেও শেষ পর্যন্ত তা দলীয় রূপই নেয়। এটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিতে কামব্যাক বা পুনর্বাসনের একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।"
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
