একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছেন এক ক্লান্ত রিকশাচালক। এএফপি
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভূতপূর্ব ও অস্থিতিশীল প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র দাবদাহ ও চরম আবহাওয়া এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সম্প্রতি ইউরোপ মহাদেশে ‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয় প্রভাবের কারণে রেকর্ড ভাঙা তাপপ্রবাহে ১,৩০০-রও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যার মধ্যে কেবল ফ্রান্সেই মারা গেছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। অপরদিকে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলবায়ু চক্র ‘এল নিনো’র সক্রিয়তা এবং স্থানীয় অপরিকল্পিত নগরায়ণের চর্তুমুখী থাবায় বাংলাদেশেও পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। যা দুই মহাদেশেরই জনজীবন, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে ফেলেছে।
চলতি গ্রীষ্মে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হতে থাকা ইউরোপে তাপমাত্রা মানবীয় সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়েছে। বায়ুমণ্ডলের উচ্চ চাপ বলয়ের কারণে সৃষ্ট ‘হিট ডোম’-এর ফলে বাতাস সংকুচিত হয়ে ভূমিতে আঘাত করায় মেঘহীন তীব্র সূর্যালোক মাঠঘাট ও জনপদকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের ঘরবাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও স্কুলগুলো এই চরম তাপমাত্রার উপযোগী করে তৈরি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। মৃতদের একটি বড় অংশই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী এবং বাড়িতে মৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত নির্গমন এবং বাতাসে আর্দ্রতার উচ্চ মাত্রা এই পরিস্থিতিকে আরও বেশি প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
এল নিনোর ছায়া ও বাংলাদেশের ‘ভস্মীভূত’ বাস্তবতা
ইউরোপের এই সংকট যখন বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলছে। তখন বাংলাদেশেও এর সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। সাধারণত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত তাপপ্রবাহের সময় থাকলেও, মানবসৃষ্ট কারণে এখন তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ২০২৪ সালে বজ্রঝড়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় গত ৭৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে তীব্র গরম পড়েছিল দেশে।
চলতি বছরে রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা একাধিকবার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে ভ্যাপসা গরম দিন ও রাতে সমানভাবে রাজত্ব করছে। যার ফলে গলে যাচ্ছে সড়কের পিচ। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ‘এল নিনো’ পূর্ণ সক্রিয় হলে দেশের বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক প্যাটার্ন বিঘ্নিত হবে এবং গরমের তীব্রতা আরও বাড়বে।
এই চরম আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন দেশের নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, কৃষক ও হকাররা। তীব্র তাপদাহের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা এই জনগোষ্ঠীর মাঝে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, জ্বর ও চর্মরোগের প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
"হিট স্ট্রেসের কারণে শরীরে ঘাম বন্ধ হয়ে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এর ফলে অচেতন হয়ে যাওয়া, পেশিতে টান এবং তীব্র মাথা ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে হিট স্ট্রোকে রূপ নিয়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।"
— সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকমণ্ডলী
কংক্রিটের জঙ্গল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ: ঢাকার মূল ক্ষত
ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও বেশি দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সবুজায়ন হ্রাস এবং বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। প্রায় ৪ কোটি ৪২ লাখ মানুষের এই মহানগরে প্রতিদিন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অভিবাসন ঘটছে। ফলে ঢাকা রূপ নিচ্ছে এক বিশাল ‘কংক্রিটের জঙ্গলে’। কলকারখানা ও যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাস, ইটের ভাটার ধোঁয়া এবং অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কমছে এবং সিসার পরিমাণ বাড়ছে, যা মহানগরের পরিবেশগত ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও উত্তরণের পথ
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের প্রধান শহরগুলোয় দিন ও রাতের তাপমাত্রার তারতম্য কমে আসবে। যার ফলে ২৪ ঘণ্টাই অসহনীয় গরম অনুভূত হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে অবিলম্বে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত অভিযোজন প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।
শহরের পরিত্যক্ত ও ফাঁকা জায়গায় জরুরি ভিত্তিতে নগর বনায়ন করা, পর্যাপ্ত পার্ক নির্মাণ, ছায়ার ব্যবস্থা এবং গণপরিসরে বিশুদ্ধ পানির ফোয়ারা স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতির ক্ষতি না করে বনায়ন বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করার মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীকে এই চরম আবহাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
