× প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন ফিচার প্রবাস সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

গাজীপুরে গ্যাসের আগুনে দগ্ধ ৩৬

সেদিন যা ঘটেছিল

ন্যাশনাল ট্রিবিউন রিপোর্ট

২১ মার্চ ২০২৪, ১৩:৩৯ পিএম । আপডেটঃ ২১ মার্চ ২০২৪, ১৩:৪১ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

সিলিন্ডারের গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ায় ১৩ মার্চ সকালে স্ত্রী নাজমা বেগম স্বামী সফিকুল ইসলামকে দোকান থেকে সিলিন্ডার আনতে তাগিদ দিয়ে কর্মস্থল পোশাক কারখানায় চলে যান। বিকেলে কর্মস্থল থেকে টিন শেডের বাসায় ফিরে সিলিন্ডার না পেয়ে ঝগড়া করেন স্বামীর সঙ্গে। 

পরে ছেলে শাকিবুল ইসলাম ও নাজমার ছোট ভাই আব্দুল মালেককে দিয়ে কাছের একটি মুদি দোকান থেকে বাকিতে একটি গ্যাস সিলিন্ডার আনান। 

বাকিতে সিলিন্ডার আনায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এ সময় সফিকুল ইসলাম ক্ষুব্ধ হয়ে গ্যাস সিলিন্ডারটি ঘরের বাইরে গলির সড়কের ওপর ফেলে দেন। 

এ সময় প্রচণ্ড বেগে গ্যাস বের হতে থাকে। তখন সফিকুল ইসলাম গ্যাস সিলিন্ডারটি সেভাবেই ফেলে রেখে গলির পথ ধরে উত্তর দিকে একটি দোকানে গিয়ে বসেন। 

ওই গ্যাস সিলিন্ডারের কাছেই সাত থেকে আট ফুট উত্তরে পাশের রুমের ভাড়াটিয়া মুক্তি আক্তার মাটির চুলায় ইফতারি তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন। সে সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাতাসের সঙ্গে মিশে যাওয়া গ্যাসে আগুন লেগে যায়। কালিয়াকৈরের তেলিরচালা এলাকার ওই কলোনির গলি দিয়ে লোকজন ঘর থেকে বের হতেই কাপড়ে আগুন ধরে যায়। নিমেষেই গ্যাসের অগুনে দগ্ধ হন শিশুসহ ৩৬ জন। এ ঘটনার পর থেকেই সফিকুল ইসলাম স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এলাকা ছাড়েন। তাকে ৯ দিন পর বুধবার রাতে ঘটনাস্থল ওই বাসায় দেখা গেছে। আর এই ৯ দিনে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত টিম ও পুলিশ কর্মকর্তারা এলাকায় পরিদর্শনে গেলেও এই ঘটনার মূল ব্যক্তি সফিকুল ও তার স্ত্রীকে খুঁজে পায়নি।

কে এই সফিকুল

সফিকুল ইসলাম সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বেড়াকুলি গ্রামের মো. বাচ্চু মিয়ার ছেলে। তিনি ৬ বছর আগে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ইউনিয়নের তেলিরচালা এলাকায় ছয় শতক জমি ভাড়া নিয়ে দুটি কলোনি বানিয়ে ১৯টি কক্ষ ভাড়া দিয়ে আয় করতেন। তার স্ত্রী নাজমা বেগম স্থানীয় স্টপ স্টার নামের একটি পোশাক তৈরির কারখানায় চাকরি করেন। এক ছেলে শাকিবুল ইসলাম ও ছোট মেয়ে তোয়া আক্তার নামের দুই সন্তান তাদের। সফিকুল জমি ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করার আগে মৌচাক এলাকায় ঘুরে ঘুরে মাছ বিক্রি করতেন। মাছের ব্যবসায় বকেয়া পড়ায় এ ব্যবসায় তেমন ভালো করতে পারেননি। ছয় বছর আগে সাত বছরের জন্য নুরু মিয়ার কাছ থেকে ওই জমি নিয়ে বস্তির মতো টিন শেডের ঘর তৈরি করে স্বল্প আয়ের পরিবারের কাছে ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতে থাকেন। 

যেদিন যা ঘটেছিল

বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কলোনির প্রত্যেক পরিবার ইফতারি তৈরিতে ব্যস্ত। সিলিন্ডারে গ্যাস না থাকার কথা স্বামী সফিকুলকে সকালে বললেও না আনায় নাজমা আক্তারের মেজাজ ছিল খিটমিটে। ঝগড়ার একপর্যায়ে নাজমা বেগম ছেলে শাকিবুল ইসলাম ও ছোট ভাই আব্দুল মালেককে দিয়ে বাকিতে সিলিন্ডার আনান। তখন সফিকুল বাসায় ছিলেন। বাকিতে সিলিন্ডার আনাতে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায় গ্যাসের চুলায় সংযোগ দেওয়ার সময় সফিকুল স্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গ্যাস সিলিন্ডারের মুখ খুলে ঘরের বাইরে গলির সড়কের ওপর ফেলে দেয়। এ সময় সিলিন্ডার থেকে দ্রুত গ্যাস বের হতে থাকলে সফিকুল ইসলাম গলি দিয়ে উত্তরের দিকে চলে যায়। সিলিন্ডারের গ্যাস যখন বাতাসে মিশে যায় তখন সাত থেকে আট ফুট দূরে গলির সড়কের পাশে মাটির চুলায় মুক্তি বেগম নামের এক ভাড়াটিয়া ইফতারি তৈরি করছিলেন। সেই চুলা থেকে নিমেষে বাতাসে মিশে যাওয়া গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এ সময় ওই গলি দিয়ে কলোনিসহ যাতায়াতকারী নারী শিশুসহ ৩৬ জনের শরীরের কাপড়ে আগুন ধরে যায়। কান্নাকাটির একপর্যায়ে কয়েকজন লোক সিলিন্ডারের মুখ চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিলে গ্যাস বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে গিয়ে দগ্ধ ৩৪ জনকে উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান তারা। বাকি এক শিশুসহ দুইজন কোনাবাড়ি এলাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

যা জানা গেছে 

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে তেলিরচালা এলাকায় টিন শেডের তৈরি ২৫টি কলোনির ৬ শতাধিক কক্ষে প্রায় ২ হাজার মানুষের বসবাস। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় স্বল্প বেতনে কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কম ঘর ভাড়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ছোট এই কক্ষগুলোতে স্বপরিবারে বসবাস করছেন তারা। ১০ ফিট বাই ১০ ফিটের কক্ষে বসবাসের পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্যাস সিলিন্ডারে রান্নাবান্নার কাজ করে থাকেন সেখানকার বাসিন্দারা। এই কলোনিগুলোতে নেই তেমন আলো বাতাস, নেই গাছগাছালি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকেই আবার মাটির চুলায় রান্না করে থাকেন। 

১৩ মার্চ গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ১১ বছরের শিশু গোলাম রাব্বির বাবা শাহ আলম বলেন, আমার মা মরা ছেলে রাব্বি স্কুল ছুটি থাকায় আমার কাছে বেড়াতে এসেছিল। গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে দগ্ধ হয়ে ছেলে মারা যায়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে ঝগড়া করেন। ঝগড়াঝাটির একপর্যায়ে সফিকুল ইসলাম গ্যাস সিলিন্ডারটি বাসার বাইরে ছুড়ে ফেলে দেন। পরে সোঁ-সোঁ শব্দ করে সিলিন্ডারটি থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। পাশে মাটির চুলায় রান্না করছিলেন এক নারী। সেখান থেকেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। আশেপাশে থাকা নারী শিশুসহ অগ্নিদগ্ধ সকলেই জীবন বাঁচতে আহাজারি করতে করতে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছিলেন। সেখানে আমার ছেলে রাব্বি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পাঁচ দিন আইসিইউতে থেকে মারা যায় রাব্বি। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর এ ঘটনার ন্যায়বিচার দাবি করেন তিনি।

ওই কলোনির ভাড়াটিয়া শাহনাজ বলেন, ঘটনার দিন তাদের মধ্যে গ্যাস নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। কেন সিলিন্ডার গলির মধ্যে ফেলে দিলেন বুঝতে পারছিলাম না। 

পোশাক শ্রমিক আমির হোসেন বলেন, আমরা এখানে আতঙ্কের সঙ্গে পরিবার নিয়ে বসবাস করি। বাড়তি লাভের আশায় বাড়ির মালিকরা ছোট ছোট ঘর বানিয়ে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। বৈদ্যুতিক শট সার্কিট কিংবা গ্যাস সিলিন্ডারের আগুন যদি কোনো একটি রুমে লাগে তাহলে পুরো এলাকাটি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এখানে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। দুর্ঘটনা ঘটলে সরু রাস্তা দিয়ে বের হতে গিয়ে পদপৃষ্ট হয়েই মারা যাবে অনেকে। আমাদের বেতন কম তাই অল্প টাকায় বাসা ভাড়া পাওয়ায় আমরা এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করি।

National Tribune

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন

যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574

ই-মেইল: [email protected]

ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 National Tribune All Rights Reserved.