আদানি গ্রুপ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ভারতের আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে বিগত সরকারের করা বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তিকে 'রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী ও সীমাহীন দুর্নীতির দলিল' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা জাতীয় কমিটি। অন্যায্য শর্তের কারণে ভারতকে প্রতিবছর ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা) বাড়তি গুণতে হচ্ছে বাংলাদেশের। সার্বিক তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে চুক্তিটি বাতিল এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো সুপারিশ করেছে কমিটি।
গত রোববার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট বিশ্লেষকরা এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। সাবেক বিচারক, অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি বিগত সরকারের আমলে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য এ কমিটি গঠিত হয়। বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকসহ কমিটির শীর্ষ ব্যক্তিরা এ পর্যালোচনায় যুক্ত ছিলেন।
কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, "ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপানোর অদ্ভূত শর্ত রয়েছে চুক্তিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন বিদ্যুতের দর ছিল ৪.৪৬ সেন্ট, তখন আদানির সঙ্গে ৮.৬১ সেন্টে চুক্তি করা হয়। যে তথ্য ও আলামত পাওয়া গেছে, তা দিয়ে আদানির চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দেশের মানুষকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।"
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ ও অতিরিক্ত শর্ত আরোপ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়মনীতি ও স্বচ্ছতা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। ২৫ বছরের মেয়াদে এই একটি চুক্তির মাধ্যমেই আদানির কাছে অন্তত ১ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত চলে যাবে। পর্যালোচকদের মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বড় ধরনের দুর্নীতি ছাড়া এমন একপেশে চুক্তি কোনোভাবেই সম্পাদিত হতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের সরাসরি নির্দেশে এবং সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সক্রিয় মধ্যস্থতায় এসব দেশবিরোধী চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তিগুলোর সুবাদে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নির্দিষ্ট এক গোষ্ঠী উপকৃত হলেও বর্তমানে পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি) দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়েছে। ২০১৫ সালেও পিডিবির লোকসান ছিল সাড় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিগত বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এছাড়া দেশে প্রায় ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াট অলস বিদ্যুৎ সক্ষমতার পেছনে সরকারকে বছরে ৯০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ (কেন্দ্রভাড়া) দিতে হচ্ছে।
চুক্তি বাতিলের আইনি ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "চুক্তিগুলো অত্যন্ত কারিগরি ও জটিল হওয়ায় পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে কিছুটা সময় লেগেছে। সার্বিক প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। দুর্নীতি প্রমাণ ব্যতিরেকে সার্বভৌম চুক্তি বাতিল কঠিন হলেও, বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও দুদক এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে।"
তিনি আরও সতর্ক করেন, চুক্তি বাতিলের কঠোর পদক্ষেপে গেলে আদানি সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে পারে, যার ফলে দেশে লোডশেডিং বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক রক্তক্ষরণ ও অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে সাময়িক এই ত্যাগ স্বীকারে দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, পর্যালোচনা কমিটির এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে লিখিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। তারা দাবি করেছে, পর্যালোচনা কমিটির আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবেদন তারা এখনো হাতে পায়নি এবং বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তাদের সাথে কথা বলেনি। বকেয়া বিল জমে থাকা সত্ত্বেও তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রেখেছে বলেও দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামিট, রিলায়েন্স ও এস আলম গ্রুপের মতো আরও একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় রাজস্বের যে ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে দ্রুত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে (আর্বিট্রেশন) যাওয়া এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
রিলায়েন্ট মিডিয়া
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
