পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য বন্দরের মনোয়ারা ফিশ আড়তে গভীর সাগর থেকে এক খেয়ায় ধরা পড়া ৪৬ মণ বড় আকৃতির ইলিশ বরফজাত করার প্রস্তুতকালে আড়তদার ও জেলেদের কর্মব্যস্ততা।
দীর্ঘদিনের খরা ও আর্থিক মন্দা কাটিয়ে বঙ্গোপসাগরের পায়রা সমুদ্রবন্দরের শেষ বয়া সংলগ্ন গভীর সাগরে এক খেপেই ধরা পড়েছে ৪৬ মণ বড় আকারের ইলিশ। শুক্রবার দুপুরে পটুয়াখালীর বিখ্যাত মহিপুর মৎস্য বন্দরে এই বিশাল চালান পৌঁছানোর পর আড়তে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে মাছগুলো প্রায় ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে উপকূলীয় এলাকায় একক ট্রলারে ইলিশ আহরণের অন্যতম বৃহৎ রেকর্ড।
মৎস্য বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার গভীর সাগরে ‘এফবি জুনাইদ’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারে প্রথমবার জাল ফেলতেই এই অভাবনীয় সাফল্য পান আলমগীর মাঝি ও তাঁর সঙ্গীরা। জাল টেনে তোলার পর দেখা যায়, তাতে আনুমানিক ২ হাজার ২০০ পিস রূপালী ইলিশ আটকা পড়েছে। পরবর্তীতে শুক্রবার দুপুরে ট্রলারটি মহিপুর বন্দরের মনোয়ারা ফিশ আড়তে ভিড়লে উৎসবমুখর পরিবেশে ডাকের মাধ্যমে মাছগুলো বিক্রি করা হয়।
এফবি জুনাইদ ট্রলারের প্রধান কাণ্ডারি আলমগীর মাঝি বলেন, "প্রায় পাঁচ বছর পর একসঙ্গে এত বড় চালানের মাছ পেয়েছি। একবার জাল ফেলতেই প্রায় দুই হাজার ২০০ পিস ইলিশ ধরা পড়ে। দীর্ঘদিনের লোকসানের পর এমন বড় সাইজের মাছ পেয়ে আমরা খুবই খুশি।"
নিলাম সম্পন্ন হওয়ার পরপরই তাজা ইলিশগুলো আধুনিক উপায়ে বরফজাত করে দ্রুত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রধান মাছের বাজারগুলোতে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘদিন পর আকস্মিক বিশাল এই চালানের আগমন ও বড় আকারের কারণে বাজারেও মিলছে চড়া দাম, যা জেলেদের দীর্ঘদিনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বড় ধরনের সহায়তা করছে বলে নিশ্চিত করেছেন আড়ত সংশ্লিষ্টরা।
মনোয়ারা ফিশ আড়ত ম্যানেজার সগির আকন বলেন, "দীর্ঘদিন পর এত বড় চালানের ইলিশ বন্দরে এসেছে। বর্তমান বাজারে ইলিশের ব্যাপক চাহিদা ও ভালো দাম থাকায় জেলেরা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো মূল্য পেয়েছেন। সচরাচর এত বড় আকারের ইলিশ একসঙ্গে মেলে না।"
মাছের সাইজ ও দামের পরিসংখ্যান:
হঠাৎ সাগরে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন জেলা ও স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, পরিবেশের পরিবর্তন এবং বৃষ্টিপাতের অব্যাহত ধারাই এই ইতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, "এখনই মূলত ইলিশ আহরণের প্রকৃত সময়। এ সময় ইলিশ দলবদ্ধ হয়ে মিঠা পানির দিকে ধাবিত হয়। সাগর থেকে নদীর দিকে আসার পথে জেলেদের ফেলানো জালে ইলিশের পুরো ঝাঁক আটকে গেলেই এমন বিপুল পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়।"
কলাপাড়া সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, কিছুদিন আগেও সাগরে আশঙ্কাজনক ইলিশ খরা চলছিল। তবে সাম্প্রতিক টানা ও ভারী বৃষ্টির প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে নদীর মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাগরের তলদেশ থেকে ইলিশ উপকূলমুখী হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে জেলেদের জালে আরও ইলিশ ধরা পড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান এই সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েও একটি দায়িত্বশীল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন।
‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্প গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান, "একসঙ্গে এত ইলিশ ধরা পড়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে জেলেদের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি দিয়েছে। তবে এক দিনের বেশি আহরণকে সামগ্রিকভাবে ইলিশের প্রাচুর্যের স্থায়ী সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর জন্য ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক ডেটা ও পর্যবেক্ষণ জরুরি। এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা ও অভয়াশ্রম সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।"
এক খেপেই ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রির এই ঘটনা বর্তমানে মহিপুর ও পার্শ্ববর্তী মৎস্যবন্দরগুলোতে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এবং উপকূলীয় প্রজনন নীতি কঠোরভাবে মানা হলে আগামী দিনগুলোতে সাধারণ জেলেদের দীর্ঘদিনের আর্থিক ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
রিলায়েন্ট মিডিয়া
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
