হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মেগা অবকাঠামো ‘তৃতীয় টার্মিনাল’ নির্মাণ প্রকল্পে ৪ হাজার ৪৬৯ কোটি ৯ লাখ ৩১ হাজার ৭৬৬ টাকার অকল্পনীয় আর্থিক ক্ষতি ও ব্যাপক অনিয়ম উন্মোচিত হয়েছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) সাম্প্রতিক অডিট প্রতিবেদনে। বিগত সরকারের আমলে শুরু হওয়া ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বিশাল প্রকল্পে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন, কোনো অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, ভুয়া ‘ভ্যালু ইঞ্জিনিয়ারিং’ সুবিধা এবং বাজারদরের চেয়ে ১২০ গুণ বেশি দামে গাছ কেনার মতো ২৭টি সুনির্দিষ্ট খাতে অনিয়ম চিহ্নিত করেছে সিএজি। এ ঘটনায় সাবেক সরকারের আমলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চরম প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানিয়েছে, অনিয়মে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম সিএজির অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয়-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।"
সিএজি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ শুরু করে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম' (এডিসি)। সর্বমোট ২১,৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাজেটে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা 'জাইকা' তহবিল জোগান দেয় এবং বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ৫,০০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করে। তবে সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় উন্নয়ন সহযোগী, পরামর্শক ও ঠিকাদার একই দেশের হওয়ায় স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি এবং প্রশাসনিক নজরদারির চরম ঘাটতি প্রমাণিত হয়েছে।
সিএজির ২৭ খাতের অনিয়ম অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকপ্রদ সব আর্থিক বিশৃঙ্খলা। কোনো প্রশাসনিক কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তির তোয়াক্কা না করে ভেরিয়েশনের মাধ্যমে ঠিকাদারকে ১,৯৮৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। তাছাড়া, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারের কাছ থেকে ১,৫৫৬ কোটি ৩২ লাখ টাকার বিলম্ব ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়নি। উল্টো সময়ের আগে কাজ শেষের অসত্য যুক্তিতে 'ক্যাচ-আপ' ও 'মুভ ফরোয়ার্ড' কস্ট বাবদ ২১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ডিপিপিতে কোনো সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও 'সফট ওপেনিং' আয়োজনের নামে আরও ৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয়েছে পুকুরচুরির নানা বৈচিত্র্যময় চিত্র। মাটি সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরে ফেলার চুক্তি থাকলেও ২ কিলোমিটারের মধ্যে ফেলে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ৫২ কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত ভেঙে ইতালি, থাইল্যান্ড বা কোরিয়ার নির্ধারিত মানের পণ্যের পরিবর্তে চীন ও ভারত থেকে নিম্নমানের পণ্য এনে বিল পাশ করা হয়েছে। এমনকি বাজারদরে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা মূল্যের প্রতি চারাগাছের বিপরীতে গড়ে ৫৯,৮৫১ টাকা করে মোট ৫৮০টি গাছের দাম বাবদ ৩ কোটি ৪৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা পরিশোধ করার তথ্য পাওয়া গেছে, যা স্বাভাবিক বাজারদরের চেয়ে ১২০ গুণ বেশি।
প্রকল্পটিতে হওয়া দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, "মেগা প্রকল্প মানেই যেন মেগা দুর্নীতি। গত সরকারের আমলে হওয়া এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসাজশ বা দায় আছে কি না, তা-ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
সরকারের পর্যটন ও বিমান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিএজির অডিট রিপোর্ত পর্যালোচনা শেষ করে দায়ীদের চিহ্নিত করার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অনিয়ম ও অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়কারীদের থেকে সিএজির সুপারিশ অনুযায়ী টাকা বাজেয়াপ্তকরণসহ যথাযথ ফৌজদারি আইনি প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
রিলায়েন্ট মিডিয়া
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
