আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) লোগো। ছবি: এইচআরডব্লিউর ফেসবুক থেকে
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা থেকে মিরাজ শেখ (৩০) নামের এক জেলেকে গুম করার সাম্প্রতিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরুর জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, কোস্টগার্ডের হেফাজতে মিরাজ শেখকে সর্বশেষ দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যা ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম গুমের ঘটনা হতে পারে। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্বকারী প্রস্তাবিত আইনি সংস্কার থেকে সরে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে সংগৃহীত প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত ১০ এপ্রিল ২০২৬ রাতে মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে জেলে মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ডের সদস্যরা স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যান। পরদিন মিরাজের পরিবার দিগরাজে অবস্থিত কোস্টগার্ড কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে প্রথমে জানানো হয় তিনি একটি 'অভিযানে' আছেন। তবে বিকেলে পুনরায় গেলে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানায়, মিরাজ কখনোই তাদের হেফাজতে ছিলেন না।
পরবর্তীতে ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ডের সদস্য পরিচয়ে এক ব্যক্তি এসে মিরাজের ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেল নিয়ে যান এবং পরদিন তা ফেরত দিয়ে যান বলে জানান স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী। মিরাজ শেখের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন জানান, "প্রত্যক্ষদর্শীরা গুম করার সময় ও পরিস্থিতি এবং কোস্টগার্ডের সদস্যরা কীভাবে তাঁকে তুলে নিয়ে গেছেন। তার সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন।"
পরিবারের সদস্যরা প্রশাসন ও সংবাদ সম্মেলনে একাধিকবার আকুতি জানিয়ে বিচার না পাওয়ায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। শুনানি শেষে গত ১২ জুলাই মহামান্য হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিখোঁজ মিরাজকে খুঁজে বের করে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে হাজির করার কড়া নির্দেশ দেন। তবে কোস্টগার্ডের পশ্চিমাঞ্চলের জনসংযোগ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন আটকের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন। মিরাজের বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ জানায়, সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ গুমের শিকার হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫' এবং 'গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশগুলোর অধীনে মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন তদন্ত এবং কোনো পরোয়ানা ছাড়াই বন্দিশালা পরিদর্শনের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
তবে নবনির্বাচিত সরকার ওই অধ্যাদেশগুলোর মেয়াদ শেষ হতে দিয়ে একটি নতুন আইনি রূপরেখার প্রস্তাব করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নতুন প্রস্তাবিত খসড়ায় গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুনরায় পুলিশের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে এবং কমিশনের ভূমিকা কেবল 'সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে প্রতিবেদন চাওয়া'-র মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, "শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং সর্বশেষ এ ঘটনা দেখাচ্ছে। যথাযথ সংস্কার ছাড়া এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। নতুন সরকারের উচিত তাদের প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং কমিশনকে গুমের ঘটনা তদন্তের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়া।"
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশে মানবাধিকার ও আইনি সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি একটি বড় পরীক্ষা। পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর নিজেদের অপরাধ নিজেরাই তদন্ত করলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা তৈরি হবে না বলে সতর্ক করেছে এইচআরডব্লিউ। বিচার বিভাগীয় নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
