উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের বিপুল চাপ সামাল দিতে খুলে দেওয়া হয়েছে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট। ফাইল ছবি
ভারতের উত্তরভাগ থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির চাপ সামাল দিতে উজান সীমান্তসংলগ্ন তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট (গেট) একসাথে খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর ফলে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী তীরবর্তী জেলাগুলোতে আকস্মিক বন্যার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আজ বুধবার (২৪ জুন) দুপুর পর্যন্ত নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি হু হু করে বেড়ে সতর্ক সীমার কাছাকাছি পৌঁছায় নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, ভারতের গজলডোবা এবং ডৌমুহুনি পয়েন্টে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা অববাহিকার ভারতীয় অংশের বাঁধগুলো খুলে দেওয়া হয়। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই পানির বিপুল চাপ সামলাতে নিজেদের তিস্তা ব্যারাজের সবগুলো গেট খুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর পাশাপাশি সিলেট ও ময়মনসিংহে বৃষ্টিপাত বাড়ছে এবং আগামী ২৮ জুন থেকে এই বৃষ্টির প্রবণতা আরও তীব্র রূপ নিতে পারে।
বর্তমানে তিস্তা, সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও আগামী সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের বড় এলাকা প্লাবিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
"পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে উত্তরের নদী তীরবর্তী বিভিন্ন জেলার নিচু এলাকাগুলোতে তীব্র বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিস্তার ৪৪টি গেটই বর্তমানে খোলা রয়েছে।"
— রেজাউল করিম মানিক, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার মৌসুমে জুন-জুলাই মাসের এই বন্যা মূলত অভ্যন্তরীণ বৃষ্টির চেয়ে ভারতের আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদীগুলোতে তৈরি করা ড্যাম বা বাঁধ খুলে দেওয়ার কারণে বেশি ত্বরান্বিত হয়। বাংলাদেশের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে ৫৪টিই ভারতের সাথে যৌথভাবে প্রবাহিত। শুষ্ক মৌসুমে ভারত উজানে পানি আটকে রাখায় বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্য সংকুচিত হয়ে পড়ে, ফলে বর্ষায় হঠাৎ খুলে দেওয়া বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি ঢল ধারণ করার ক্ষমতা এই নদীগুলোর থাকে না।
এদিকে প্রতিবছর আকস্মিক বন্যার এই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নেপাল, ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে বহুপাক্ষিক সমঝোতা ও কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছে।
নদী গবেষক ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, "একটা যৌথ নদী কমিশন আছে শুনি, কিন্তু তার কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম তো দেখি না। নেপাল, ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ—এই চারটা দেশের মধ্যে নদী ইস্যুতে একটা স্থায়ী সমঝোতা থাকতে হবে।"
যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, মে মাস থেকে ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন বাংলাদেশের সাথে তথ্য বিনিময় শুরু করলেও তা দেশের বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত নয়। তবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দাবি করা হয়েছে।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, "ভারত আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে, পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের এলাকাকে তারা বন্যায় প্রভাবিত করবে না। আমাদের যৌথ নদী কমিশনের টিম এবং মন্ত্রণালয়ও তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। বিগত দিনে যেভাবে তারা বাঁধের গেটগুলো খুলে দিত, এই বিষয়গুলো আমরা এখন টাইম টু টাইম মনিটর করছি।"
নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণ নীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর গভীরতা কমে যাওয়া। নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়া এবং নির্বিচারে খাল-নালা দখল হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষায় আকস্মিক বন্যার তীব্রতা ও নদীভাঙন প্রতিবছরই বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
