শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতকে আধুনিকায়ন, সমরাস্ত্রের উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে যৌথ সমরাস্ত্র উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের এক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ও তুরস্ক। দুই দেশের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী’ পর্যায়ে একটি স্থায়ী যৌথ কমিটি গঠন এবং প্রতি বছর ‘টু প্লাস টু’ (২+২) পরামর্শমূলক নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিন দিনের ঢাকা সফরের শেষ দিনে শনিবার (৬ জুন) তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জামের শীর্ষ উৎপাদক হিসেবে উদীয়মান তুরস্কের এই প্রস্তাব বাংলাদেশের সমরাস্ত্র বাজারে একক চীনা নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ও সাশ্রয়ী বৈশ্বিক প্রযুক্তির দুয়ার উন্মোচন করবে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন। এই লক্ষ্য অর্জনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিরক্ষা শিল্পে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন।
যদিও সফরে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে, তবে পর্দার অন্তরালে মূল ফোকাস ছিল সামরিক ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সমরাস্ত্রের সরাসরি আমদানিকারক থাকার চেয়ে এখন নিজস্ব প্রযুক্তির বিকাশে 'প্রুক্তি হস্তান্তর' ও যৌথ উৎপাদনকে শর্ত হিসেবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যেখানে তুরস্ক সম্পূর্ণ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
বিগত এক দশকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে তুরস্কের তৈরি চালকবিহীন ড্রোন ও অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেমের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের বিশ্বের ৩ নম্বর অস্ত্র আমদানিকারক দেশ তুরস্ক রাষ্ট্রীয় কৌশলের মাধ্যমে ২০১৮ সালের মধ্যেই বিশ্বের ১৪তম শীর্ষ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ২০২২ সালে সম্পাদিত ড্রোনের চুক্তিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে এবার গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা আধুনিকায়নসহ বাংলাদেশে যৌথভাবে ড্রোন, ট্যাংক এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, "চীনা অস্ত্র বাজারের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা বাংলাদেশের সামরিক নীতিতে রয়েছে। তবে মার্কিন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্ত্রের দাম আকাশচুম্বী। সেই বাস্তবসম্মত প্রেক্ষাপটে সমরাস্ত্রের উৎস বৈচিত্র্যকরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও সাশ্রয়ী মূল্যের দিক থেকে তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সেরা বিকল্প।"
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক নতুন নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তুরস্ক থেকে মাইন-সুরক্ষিত সামরিক যান, বহুমাত্রিক রকেট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার, সাঁজোয়া যান, পোর্টেবল জ্যামার এবং স্কাইগার্ড রাডার সিস্টেমের মতো সমরাস্ত্র সফলভাবে সংগ্রহ করেছে। এবার সমরাস্ত্রের বাইরেও তুর্কি সামরিক একাডেমিতে বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের উচ্চতর কৌশলগত ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, "জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সামরিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন জরুরি। পাকিস্তান ও চীন যেভাবে যৌথভাবে যুদ্ধবিমান তৈরি করছে, তুরস্ক ও বাংলাদেশও সেভাবে যৌথ সমরাস্ত্র উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকেও এতে পূর্ণ সম্মতি রয়েছে।"
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের এই সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে গভীর ভূ-রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর ভূ-রাজনৈতিক বলয় তৈরিতে নেতৃত্ব দিতে চাইছে। রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুরস্ক শুরু থেকেই ঢাকাকে দৃঢ় কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে।
২০২০ সালে তৎকালীন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলিত শাভিসলুর ঢাকা সফরের পর, ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর তুরস্কের এই যোগাযোগ ও অংশীদারিত্বের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ তুরস্ককে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে এবং ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে নিছক সামরিক বলয় থেকে বের করে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশীদারিত্বে রূপ দেবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
