রাজধানীর মিরপুরের এই বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকেই গত ৩১ মে প্রবীণ নারী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুরে নিজ মেয়ের ফ্ল্যাট থেকে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ৭৫ বছর বয়সী প্রবীণ নারী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ৩১ মে (শুক্রবার) রাতে পল্লবী থানা পুলিশ প্রবীণ এই মায়ের মরদেহ উদ্ধার করে, যার ডান চোখ ও পিঠে পোকা ধরেছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। এই চরম অবহেলার ঘটনায় পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণার পর, আজ বুধবার বিকেলে ওই নারীর বড় ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমানকে তাঁর পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠার পর আজ দুপুরে নীরবতা ভেঙে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ছোট ছেলে বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর মা ও বোন উভয়েই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন, তবে মৃত্যুর পেছনে সন্তানদের অবহেলার অভিযোগটি সত্য নয়।
বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান আজ গণমাধ্যমের কাছে তাঁদের পারিবারিক ট্রমা ও মায়ের শারীরিক-মানসিক অবস্থার বিবরণ দেন। গতকাল মঙ্গলবার কথা বলতে রাজি না হলেও, আজ তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করে বলেন, "মা মারা যাওয়ার পর আমরা এমনিতেই মানসিক ট্রমার মধ্যে আছি। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের নিয়ে নানা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, এতে আমরা মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছি।"
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী নূর জাহান বেগমের মৃত্যু মরদেহ উদ্ধারের অন্তত দুদিন আগে হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নূর জাহান বেগমের এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আজ দুপুরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, "এ ঘটনায় পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন আছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" এই বক্তব্যের পরপরই বিকেলে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আনিসুর রহমানকে তাঁর পদ থেকে প্রত্যাহার করে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।
পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামছুর রহমান, যিনি মরদেহ উদ্ধারের শুরু থেকে উপস্থিত ছিলেন, তিনি বলেন, "একজন নার্স সরকারের জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে আমরা ওই ফ্ল্যাটে যাই। গিয়ে দেখতে পাই, পুরো বাসাটি বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী এবং চারপাশ চরম নোংরা। মরদেহটি বিছানায় পড়ে ছিল এবং দীর্ঘ সময় অবহেলায় পড়ে থাকায় তাঁর ডান চোখ ও পিঠে পোকা ধরেছিল।"
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও দেখা গেছে, ফ্ল্যাটের ভেতরটা চরম অস্বাস্থ্যকর এবং নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো আস্তরণ পড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তবে অধ্যাপক আশিকুর রহমান মায়ের মরদেহে পোকা দেখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে পরিবেশের অস্বাভাবিকতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, "মা যেভাবে নোংরা পরিবেশে মারা গেলেন, বিষয়টি কিছুটা অস্বাভাবিক। তা নিয়ে সমালোচনাও হতে পারে। তবে আমাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ দেখভাল না করার যে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা কাম্য নয়।"
আশিকুর রহমান জানান, ২০০৮ সালে তাঁদের বাবা মো. আবুল কাশেম (বিআইডব্লিউটিসি-র সাবেক কর্মকর্তা) মারা যান। এরপর ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেই মায়ের দেখভাল করেছেন এবং করোনাকালে চিকিৎসা করিয়েছেন। ২০২৪ সাল থেকে মা তাঁর বড় বোন ফাতিমা নাসরীন সুলতানার মিরপুরের ফ্ল্যাটে থাকছিলেন। বোন ফাতিমা ২০১৭ সালে স্বামীকে হারান এবং তিনি নিঃসন্তান।
অধ্যাপক আশিকুর রহমানের দাবি, তাঁর মা ও বোন দুজনেই দীর্ঘ দিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। মায়ের আচরণ 'সিজোফ্রেনিয়া'র মতো ছিল এবং তিনি সবকিছু সন্দেহ করতেন। অন্যদিকে, একাকীত্বের কারণে বোন ফাতিমাও জীবনের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে চরম মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। তবে তাঁদের কাউকেই কখনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো হয়নি।
অধ্যাপক আশিকুর বলেন, "বাইরে থেকে কেউ বাসায় গিয়ে কাজ করবে এটা বোন পছন্দ করত না। সে নিজে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি মানসিক অবস্থার কারণে বাসা পরিষ্কার রাখতে পারত না। আমি নিজে কাজের মানুষ ঠিক করে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু মা ও বোন এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে বাদ দিয়ে দেয়। আগবাড়িয়ে কিছু করতে গেলে মা সন্দেহ করতেন, তাই এ নিয়ে আসলে আমার কিছু করার ছিল না।"
তিনি আরও জানান, গত ৩১ মে বিকেল চারটার দিকে বোন ফাতিমা ফোন করে জানান যে মা কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। এরপর তিনি গিয়ে নার্স ডাকাসহ পুলিশি প্রক্রিয়া ও গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে দাফনের কাজ সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তাঁর বোন মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে ফাতিমা নাসরীনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন এবং তাঁর ফ্ল্যাটের দরজাও ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়া যায়।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের কর্মকর্তার মায়ের এমন করুণ মৃত্যু দেশের প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনের কার্যকারিতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে নতুন করে নাগরিক সমাজে গভীর প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
