ঝিনাইদহ জেলার ভাটই বাজার আসান নগর গ্রাম থেকে তিন বোন সানজিদা আক্তার স্বর্ণা, শাবনাজ ও ফারজানা ইয়াসমিনের পাঠানো তাদের কোরবানির গরুর ছবি।
পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে অসচ্ছল ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের কোরবানি দেওয়ার বিধান নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মানুষের মনে নানা জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়। ইসলামি শরিয়তের নীতিমালা অনুযায়ী, কোরবানি মূলত একটি নির্দিষ্ট আর্থিক ও আত্মিক ইবাদত, যা কেবল ‘নিসাব’ বা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের মালিকদের ওপরই ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক) করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি ঋণের বোঝায় জর্জরিত থাকেন কিংবা হাতে নগদ টাকা না থাকায় ঋণ করে কোরবানি দিতে চান, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তার কোরবানি সহিহ হবে কি না, তা নির্ভর করছে ওই ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সম্পদের ধরনের ওপর।
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর যার কাছে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ, সাড়ে ৫ Worst (৫২.৫) ভরি রুপা কিংবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসায়ী পণ্য থাকবে, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না করেন, তবে তাকে ওয়াজিব তরক করার গোনাহের ভাগীদার হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, "যে সম্পদ থাকলে জাকাত ওয়াজিব হয়, সেই ধরনের সম্পদ যদি কারও কোরবানির দিনগুলোতে থাকে, তবে তার কোরবানি ওয়াজিব হবে। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তারা যদি তা পালন না করেন, তবে তারা ওয়াজিব তরক করার গোনাহর ভাগীদার হবেন।"
সাধারণ মানুষের মাঝে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য কোরবানি প্রযোজ্য নয়। তবে ইসলামি গবেষকেরা বিষয়টিকে দুটি ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন। যেসব ব্যক্তির জীবনযাত্রা একেবারেই চলে না, থাকা-খাওয়ার জন্য অর্থ নেই এবং তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে ঋণগ্রস্ত, তাদের জন্য কোরবানি কোনোভাবেই ওয়াজিব নয়।
তবে যার কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পূরণ হয়েছে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নেই—এমন ব্যক্তি যদি ঋণ করে কোরবানি করেন, তবে তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হলো, ঋণটি পরিশোধ করার মতো নিশ্চিত উৎস বা সামর্থ্য তার থাকতে হবে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ আরও বলেন, "কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পূরণ হওয়ার পর, যদি কোনো ব্যক্তি তার হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকার কারণে ঋণ করে কোরবানি করেন, তবে তার এই ইবাদতটি সহিহ হবে এবং ওয়াজিব আদায় হবে। তবে এই ঋণের বোঝা পরিশোধ করার সামর্থ্য তার থাকতে হবে, যাতে করে পরবর্তীতে তা তার জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়।"
অনেকেই বাণিজ্যিক প্রয়োজনে বা ব্যক্তিগত গাড়ি-বাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে থাকেন। ইসলামি শরিয়ত মতে, কোনো ব্যক্তির যদি বিশাল সম্পত্তি বা ব্যবসা থাকে, যার বিপরীতে তিনি ঋণ নিয়েছেন, তবে তিনি মূলত সচ্ছল। সম্পদ থাকার কারণে তার ওপর কোরবানি ও হজের মতো বিধানগুলো যথানিয়মেই ওয়াজিব থাকবে।
তবে ধর্মীয় বিশ্লেষকরা একটি বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—শরিয়ত অনুযায়ী সুদভিত্তিক যেকোনো লেনদেন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। যেহেতু কোরবানি একটি পবিত্র ও বিশুদ্ধ ইবাদত, তাই সুদের মতো অপবিত্র বা অবৈধ উপায়ে সংগৃহীত অর্থ দ্বারা কোরবানি সম্পন্ন করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ থেকে এক কোটি গবাদিপশু কোরবানি হয়। একা পশু কেনা সম্ভব না হলে শরিকানার ভিত্তিতে কোরবানির নিয়ম রয়েছে। বিধান অনুযায়ী—গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি শরিক হতে পারেন; তবে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেবল একজনের নামেই উৎসর্গ করতে হবে। এছাড়া কোরবানির পশুর বয়সসীমা নির্ধারণে বলা হয়েছে যে, গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে অন্তত দুই বছর, উটের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর এবং ছাগল বা ভেড়ার ক্ষেত্রে অন্তত এক বছর পূর্ণ হতে হবে।
কোরবানির মূল দর্শন প্রসঙ্গে আলেমদের মত হলো, এটি কোনো সামাজিক প্রতিযোগিতা বা লোকদেখানো উৎসব নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর সন্তুষ্টির আমল। কোরবানির সমপরিমাণ অর্থ গরিবদের মাঝে দান করে দিলে ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না, কারণ পশুর রক্ত প্রবাহিত করাই এই ইবাদতের প্রধান শর্ত। তবে সমাজের দরিদ্র মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে অতিরিক্ত পশু কোরবানি করতে পারেন, যা ইসলামে প্রশংসনীয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
