বুধবার রাজধানীর ইউনিসেফ কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স (বামে)। ছবি: ইউনিসেফের সৌজন্যে
সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে স্মরণকালের ভয়াবহতম হামের প্রাদুর্ভাব ও মহামারি দেখা দিয়েছে, যেখানে চলতি বছরেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৪৭৫ জন শিশু। বিশ্বসংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অন্তত ৫ বার লিখিত চিঠি এবং ১০টি জরুরি বৈঠকে আসন্ন টিকা-সংকট সম্পর্কে বারবার সতর্ক করা হলেও প্রশাসন সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়।
বুধবার (২০ মে) দুপুরে রাজধানীর ইউনিসেফ কার্যালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করেন ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশে চলমান কৃত্রিম টিকা-সংকট, মাঠপর্যায়ে এর মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় এবং তা কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক এই সংস্থার গৃহীত বিভিন্ন জরুরি পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, "হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।"
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ববর্তী সুরক্ষিত ও দ্রুততম মাধ্যম পরিহার করে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়ের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সময়মতো জীবনরক্ষাকারী টিকা দেশে এসে পৌঁছায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইউনিসেফের বিশেষ তৎপরতায় ইতিমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে সফলভাবে হামের টিকা প্রদান করা সম্ভব হয়েছে, যার ফলে বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা গিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য জাতীয় মজুত অবিলম্বে পুনরুদ্ধার করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
টিকা-সংকট ও হামে আশঙ্কাজনক হারে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে যে বিশেষ তদন্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে স্বাগত জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংবাদ সম্মেলনে এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, "তদন্তের যেকোনো প্রয়োজনে ইউনিসেফ সব সময় সত্য ও স্বচ্ছতার পক্ষে কাজ করবে।"
রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, সরকার চাইলে নিজস্ব উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা ক্রয় করতে পারে, তবে মনে রাখতে হবে যে টিকার মজুত সার্বক্ষণিক নিশ্চিত রাখা জরুরি। সাধারণ উন্মুক্ত টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক বাজার থেকে টিকা সংগ্রহ করতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়, যেখানে ইউনিসেফের প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে মানসম্পন্ন টিকা নিশ্চিত করা সম্ভব।
পরিসংখ্যানের দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ২৫,৯৩৪ জন আক্রান্তের রেকর্ড ছিল, যার পর থেকে সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় এবং বিগত ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২ জন। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে যথাক্রমে ২,৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ এবং ২৪৭ জন আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর কোনো ঘটনা ছিল না।
এর আগে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারেও বলেছিলেন যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রতিরোধে তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে শুরু থেকেই নানামুখী সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিলেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও সিদ্ধান্তহীনতার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের লাখো শিশুকে, যা জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য এক চরম উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
