কক্সবাজারের চকরিয়ায় কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত দেশপ্রেমিক তরুণ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন। আজ বুধবার বিজ্ঞ আদালত তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মামলায় চারজনকে মৃত্যুদণ্ড ও নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। ফাইল ছবি
কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাত বিরোধী অভিযানে গিয়ে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে তরুণ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যার দায়ে চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দেড় বছর আগের এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর পাঁচ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২০ মে) দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সবাই চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের বাসিন্দা।
আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— মো. হেলাল উদ্দিন, নুরুল আমিন, মো. নাছির উদ্দিন ও মোর্শেদ আলম। এদের মধ্যে মোর্শেদ আলম বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
হত্যার মূল সাজার পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় (ডাকাতির প্রস্তুতি ও সমাবেশ) অপরাধী সাব্যস্ত করে এই ১৩ জন আসামিকে অতিরিক্ত আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত।
কক্সবাজার আদালতের এই রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
যেভাবে ঘটেছিল সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড
২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ৩টার দিকে চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে একদল সশস্ত্র ডাকাতের উপস্থিতির খবর পায় সেনাবাহিনী। খবর পাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে চকরিয়া আর্মি ক্যাম্পের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
অভিযান পরিচালনাকালে ২৩ বছর বয়সী তরুণ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পিছু ধাওয়া করে ৭-৮ সদস্যের ডাকাত দলটির কয়েকজনকে আটকে ফেলেন। এ সময় ডাকাতরা আকস্মিকভাবে তার ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করলে আশঙ্কাজনকভাবে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় দ্রুত তাকে উদ্ধার করে মালুমঘাট মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক এই দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
টাঙ্গাইলের সন্তান লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন পাবনা ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে মিলিটারি একাডেমির ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে দেশমাতৃকার সেবায় কমিশন লাভ করেছিলেন। তার এই অকাল ও নির্মম মৃত্যু সে সময় গোটা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল।
হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও ডাকাতির প্রস্তুতির মামলা করেন। একই ঘটনায় চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন অস্ত্র আইনে আরেকটি পৃথক মামলা দায়ের করেন।
পরবর্তীতে চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী সুদীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রাথমিক এজাহারের ভুলত্রুটি সংশোধন করে এবং নতুন তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত আজ এই রায় প্রদান করেন। রায়ের পর বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর গণমাধ্যমকে বলেন, "একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা দেশের সেবায় গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। আদালত কেবল অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছেন। রাষ্ট্র ও দেশবাসী আজ ন্যায়বিচার পেয়েছে।"
বাদীপক্ষের আরেক আইনজীবী আহসান সেজান আদালতের পর্যবেক্ষণের বরাত দিয়ে জানান, বিচারক সামাজিক ন্যায়বিচার ও জননিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সাথে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন সাজা না পান, সেটিও নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই রায়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আসামিপক্ষ। পাঁচ ও ছয় নম্বর আসামির আইনজীবী তাহসিন সিফাত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, "আমরা মনে করছি আমার মক্কেলরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পেলেই এই রায়ের বিরুদ্ধে মহামান্য উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করব।"
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর ওপর এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলার বিরুদ্ধে এই রায় একটি কঠোর বার্তা। রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেশের অপরাধ প্রবণতা কমাতে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
