দেশের প্রতিটি স্তরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মর্যাদা রক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৩ মে) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় তিনি জানান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ সব নাগরিক সুবিধায় প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার সচিবালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে ভবন নির্মাণ নীতিমালা সংশোধন, গণপরিবহনে বিশেষ সুবিধা যুক্ত করা এবং স্কুলগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি। সভায় প্রাথমিকভাবে ১০টি উপজেলায় ‘শিশু স্বর্গ’ নামক বিশেষ পুনর্বাসন প্রকল্প চালুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধীদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্টসহ সরকারি-বেসরকারি সব স্থাপনায় হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের উপযোগী অবকাঠামো এবং পৃথক টয়লেট সুবিধা থাকতে হবে।
নির্দেশনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ভবনের কক্ষের দরজা এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা কোনো বাধা ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে প্রবেশ করতে পারেন। ভবন নির্মাণ নীতিমালায় এই বিষয়টির কঠোর প্রতিফলন থাকতে হবে।” এছাড়া নারীদের জন্য প্রস্তাবিত ইলেকট্রিক বাসেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত আসন ও যাতায়াত সুবিধা রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার নতুন বিশেষায়িত প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প চালু করা হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতায় এসব শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সারা দেশে পরিচালিত প্রতিবন্ধী স্কুলগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী সেগুলো সঠিকভাবে চলছে কি না, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখার আদেশ দেন। একই সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সমাজের প্রতিটি স্তরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মর্যাদা ও সক্ষমতাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এমন বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সব কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন।”
সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলসহ সরকারের নীতি-নির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা নিজ নিজ দপ্তরের সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশনা ও নতুন প্রকল্পের ঘোষণা বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী জাতীয় উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখার সুযোগ পাবে, যা ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথকে আরও মসৃণ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।