× প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন ফিচার প্রবাস সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

বজ্রপাতে মৃত্যু, সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা?

২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৬ এএম । আপডেটঃ ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৭ এএম

গতকাল রোববার কালবৈশাখী ঝড়ের সময় ঢাকা থেকে তোলা এক ঝলক বজ্রপাত। ছবি: সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার কৃষক ইলিয়াস হোসেনের মাঠ থেকে ফেরা হয়নি, ফসল দেখতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। একই গ্রামের লাবনী আক্তারও ঘরোয়া গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে শিকার হয়েছেন আকাশের এই মরণফাঁদের। গতকাল রোববার এক দিনেই দেশের সাত জেলায় কালবৈশাখীর বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। এই মৃত্যুগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং গত দেড় দশকের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন একটি ঋতুভিত্তিক পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ, যার প্রধান শিকার সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ।

আবহাওয়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'আর্থ নেটওয়ার্কস' এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মার্চ মাস থেকে বজ্রপাত বা পালস কাউন্ট বাড়তে শুরু করে এবং মে মাসে তা চূড়ায় পৌঁছায়। গত ১৫ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক দিনে সর্বোচ্চ ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল ২০১১ সালের ২৩ মে। এরপর ২০১৬ সালের মে মাসে দুই দিনে ৮৭ জনের মৃত্যু এক ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে আছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই এক দিনে ১৪ জনের মৃত্যু জানান দিচ্ছে যে, এই দুর্যোগের তীব্রতা কমেনি।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চল বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, বঙ্গোপসাগর ও স্থানীয় জলাশয় থেকে সৃষ্ট বাষ্পীভূত মেঘের মিলনস্থল এই অঞ্চল। সিলেটে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে ৮০-৯৬টি বজ্রঝলক দেখা যায়, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।

২০২৫ সালের পেশাভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান এক চরম বৈষম্যের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। গত বছর নিহত ২৬৩ জনের মধ্যে ১১০ জনই ছিলেন কৃষক। অর্থাৎ, প্রতি দুজনের একজনেরই পরিচয় কৃষি-শ্রমিক।

  • উন্মুক্ত স্থান: ফসলের মাঠ বা হাওরে কোনো উঁচু গাছ বা আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় কৃষকরা সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
  • কৃষির ধরন পরিবর্তন: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা মনে করেন, কৃষিজমি এখন কেবল মুনাফার উৎস হওয়ায় সেখান থেকে বড় গাছগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে, যা আগে প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত।

বজ্রপাত কমাতে তালগাছ লাগানো বা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মতো সরকারি প্রকল্পগুলো বাস্তবে খুব একটা কাজে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না, বরং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে সক্রিয় করে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাখহরি সরকার গুরুত্বারোপ করেন বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে দ্রুত বড় গাছ লাগানোর ওপর, যা বজ্রকে মানুষের ওপর আঘাত হানার আগেই টেনে নিতে পারবে।

বজ্রপাতকে এখন আর স্রেফ 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি এখন একটি বড় ধরনের জননিরাপত্তা সংকট। যখন সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র কৃষক বা দিনমজুররাই এর প্রধান শিকার হন, তখন রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে যায়। মার্চ-মে মাসে কেবল সংবাদের শিরোনাম না হয়ে, সারা বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করলেই হয়তো আগামী বছরের শোকগাথা থামানো সম্ভব হবে। ইলিয়াস বা লাবনীর মতো মানুষদের জীবনকে কেবল ‘পরিসংখ্যান’ হতে দেওয়া যায় না।

National Tribune

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন

যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574

ই-মেইল: [email protected]

ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 National Tribune All Rights Reserved.