জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের পর সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত করতালিতে আবেগঘন পরিবেশ। ফাইল ছবি
রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল জাতীয় সংসদ। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’ গতকাল শুক্রবার সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। এই বিলটি পাসের মাধ্যমে চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মহান আদর্শ এবং শহীদ ও আহতদের পরিবারের সুরক্ষা এখন থেকে স্থায়ী আইনি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো।
শুক্রবার বিকেলে স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিলটি কণ্ঠভোটে দিলে সংসদ সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ ধ্বনিতে সেটিকে সমর্থন জানান। বিলটি পাসের ঘোষণার সাথে সাথেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয় সংসদ কক্ষে। সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এবং টেবিল চাপড়ে দীর্ঘস্থায়ী করতালির মাধ্যমে এই মাহেন্দ্রক্ষণকে স্বাগত জানান। কক্ষজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ‘বিপ্লবের আইনি স্বীকৃতি’র স্লোগান।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান যখন বিলটি উত্থাপন করেন, তখন তিনি জুলাই বিপ্লবের মর্মস্পর্শী ইতিহাস স্মরণ করেন। বিলটির মূল লক্ষ্য কেবল শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের আর্থিক ও সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা নয়; বরং অভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ এবং এর গণতান্ত্রিক আদর্শকে জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ জুন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ইতোমধ্যেই কার্যকর থাকা সেই অধ্যাদেশটিই আজ জাতীয় সংসদে পাসের মাধ্যমে স্থায়ী আইনে রূপান্তরিত হলো। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও এই শহীদদের মর্যাদা ও পরিবারের অধিকার বিঘ্নিত হওয়ার পথ রুদ্ধ হলো।
বিলের ওপর আলোচনায় কোনো বিরোধ দেখা যায়নি, যা বর্তমান সংসদের জন্য এক অনন্য নজির। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক ঐক্যমত্যের জন্য বিরোধী দলের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। সদস্যরা একে কেবল একটি প্রশাসনিক বিল নয়, বরং দ্বিতীয় স্বাধীনতার রক্তঋণ পরিশোধের দলিল হিসেবে অভিহিত করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিল পাসের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। শহীদ পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ভাতা, আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো এখন থেকে আর কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়, বরং তাদের আইনি অধিকার।
জুলাইয়ের তপ্ত রাজপথে যারা প্রাণ দিয়েছিলেন এবং যারা পঙ্গুত্ব বরণ করে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন, এই বিলটি তাদের ত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই বিলটি সম্ভবত সেই দুর্লভ দলিল, যা ক্ষমতার দণ্ডকে ছাপিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকেই সবচেয়ে বড় আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে মর্যাদা দিল। এই আইনের সফল বাস্তবায়নই হবে শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বিষয় : জুলাই বিপ্লব সংসদ অধিবেশন
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
