জাতীয় সংসদের অধিবেশন। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া দুটি যুগান্তকারী অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পুনরায় তার পুরনো কাঠামোয় ফিরে গেছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ ও হট্টগোলের মুখে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করা হয়। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত স্বতন্ত্র সচিবালয় বিলুপ্ত হলো এবং বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের বিধানটি রহিত হয়ে গেল।
সংসদীয় কার্যক্রমের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নির্বাহী বিভাগের (আইন মন্ত্রণালয়) হাতে ফিরে এল, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
বিলটি উত্থাপনের পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এই পদক্ষেপকে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, নিম্ন আদালতকে আবারও ‘ফ্যাসিবাদী কায়দায়’ ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন আইনমন্ত্রীর পূর্বতন অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, অতীতে ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিক’ ও ‘ক্যাডার’ নিয়োগের যে সংস্কৃতি বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করেছিল, এই বাতিলের ফলে সেই পথ আবারও খুলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তবে বিদ্যমান অধ্যাদেশগুলোর পরিবর্তে আরও স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ প্রয়োজন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সরকার বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করতে নতুন পদক্ষেপ নেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এই অধ্যাদেশগুলো বিচার বিভাগের কাঠামোগত আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বিগত সরকারের আমলের ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিক’ বিচারকদের কঠোর সমালোচনা করেন। তবে বিরোধী দলের দাবি, অধ্যাদেশটি কার্যকর থাকলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল। তবে বিলে একটি সুরক্ষামূলক ধারা রাখা হয়েছে—বাতিল হওয়া অধ্যাদেশের অধীনে ইতিমধ্যে নিয়োগ পাওয়া ২৫ জন বিচারকের পদায়ন ও অন্যান্য কার্যক্রম বৈধ বলে গণ্য হবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল কাগজ-কলমে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। স্বতন্ত্র সচিবালয় এবং নিরপেক্ষ নিয়োগ পদ্ধতি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি বড় মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সরকার ‘অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের’ যে যুক্তি দিয়েছে, তা যদি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী আইনের রূপ না পায়, তবে বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের ‘নির্বাহী প্রভাবমুক্ত’ হওয়ার স্বপ্নটি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিচার বিভাগ কতটুকু মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
বিষয় : সুপ্রিম কোর্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
