সানেম।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গভীর সংকটে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ আঁচ বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সানেম এক বিশেষ বিশ্লেষণে সতর্ক করে জানিয়েছে, এই সংকটের প্রভাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাসের পাশাপাশি আকাশচুম্বী হতে পারে মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সানেম প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’ (সিজিই) মডেলের সিমুলেশন পর্যালোচনায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। বিশ্ববাজারে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়া এবং জ্বালানি রুটগুলো ঝুঁকিতে থাকায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চাপের মুখে।
সানেমের তথ্য অনুযায়ী, এই সংকটের প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা দেশের রপ্তানি ও উৎপাদনশীল খাতেও আঘাত হানবে। গবেষণায় দেখা গেছে:
সেবা ও কৃষি: পরিবহন খাতে ৩ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ১ শতাংশ উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা সামগ্রিক সরবরাহ চেইনকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় সানেম একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎসের দিকে নজর দেওয়াই এখন একমাত্র পথ। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি: জমি ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা মেনে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে মনোযোগ বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতে রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনে নেট-মিটারিং প্রক্রিয়া দ্রুত করা।
২. বাজেট বরাদ্দ ও প্রণোদনা: জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা এবং এ খাতের সরঞ্জামের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা।
৩. ভর্তুকি স্থানান্তর: জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ভর্তুকি কমিয়ে ধীরে ধীরে তা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরিয়ে নেওয়া।
৪. মজুত সক্ষমতা: আপৎকালীন সংকট মোকাবিলায় অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির একটি কৌশলগত 'জাতীয় মজুত' গড়ে তোলা।
৫. আমদানি বৈচিত্র্য: কেবল মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর না হয়ে জ্বালানি আমদানির জন্য নতুন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উৎস অনুসন্ধান করা।
৬. জ্বালানি রেশনিং: পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত 'ডিজিটাল ফুয়েল পাস'-এর মাধ্যমে রেশনিং করা এবং শিল্প কারখানার উৎপাদন সময়সূচি অফ-পিক আওয়ারে স্থানান্তর করা।
৭. দেশীয় অনুসন্ধান: স্থলভাগ ও সমুদ্রের ব্লু-ইকোনমিতে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুততর করে বেইসলোড বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র থেকে বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে এর প্রভাব এড়ানোর সুযোগ নেই। সানেমের এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আসন্ন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে হলে সরকারকে কেবল বাজার নিয়ন্ত্রণের দিকে তাকালে চলবে না, বরং জ্বালানি নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনে আত্মনির্ভরশীলতার পথে হাঁটতে হবে। সময়োচিত পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
