তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি: টিবিএস ক্রিয়েটিভ
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের দামামা আর হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ জলপথে ঘনীভূত হওয়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ছায়া এবার আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি করিডোরে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জাহাজ ব্যবহার করায় পারস্য উপসাগরের রণকৌশলগত চোরাপালিতে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের আমদানিকৃত বিশাল তেলের চালান। ফলে, প্রায় ৬০০ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি নিয়ে একটি ট্যাংকার গত এক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের রাস তানুকা বন্দরে স্থবির হয়ে আছে।
সংকটটির মূলে রয়েছে জাহাজ ভাড়ার আন্তর্জাতিক আইনি ও কৌশলগত জটিলতা। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নরভিক এনার্জি’র মাধ্যমে তেল পরিবহনের জাহাজ ভাড়া করে থাকে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন মালিকানা বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এমন বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে চরম ঝুঁকি বোধ করছে।
এই তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ‘নরডিক পোলাক্স’। গত ৩ মার্চ ১ লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড লোড করার পর থেকেই জাহাজটি সৌদি উপকূলে নোঙর করে আছে। একই অনিশ্চয়তায় পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১ লাখ টন তেল আনার অপেক্ষায় থাকা অন্য একটি ট্যাংকার ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’। মার্কিন সংশ্লিষ্টতার কারণে জাহাজটির মালিকপক্ষ এই বিপজ্জনক রুটে জাহাজ পাঠাতে চরম অনীহা প্রকাশ করেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সমুদ্র-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, "বাংলাদেশ একক দেশ হিসেবে এই পথে নিরাপদ যাতায়াতের মৌখিক নিশ্চয়তা পেলেও, মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংশ্লিষ্টতা থাকা জাহাজগুলো বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এটি আমাদের জন্য একটি বড় কৌশলগত শিক্ষা।"
জ্বালানি তেল ছাড়াও বিএসসির নিজস্ব জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ সাধারণ পণ্য নিয়ে কুয়েত যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে নিরাপত্তার খাতিরে আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরের কাছে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছে।
দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পুরোপুরি আমদানিকৃত এই তেলের ওপর নির্ভরশীল। বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি চাহিদার ৯২ শতাংশই মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্র ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছেন।
কর্মকর্তারা এখন বিকল্প হিসেবে হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত ওমান উপসাগরীয় ‘ফুজাইরাহ’ বন্দর ব্যবহারের কথা ভাবছেন। তবে সেখানে জাহাজের বার্থ পাওয়া এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের বোঝা বাংলাদেশের ভঙ্গুর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
বিপিসি প্রতি মাসে গড়ে ১ থেকে ২ লাখ টন তেল আমদানি করে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মার্চের এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রবল। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই পরোক্ষ লড়াইয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আক্ষরিক অর্থেই মাঝসমুদ্রে থমকে আছে।
বিষয় : জ্বালানি আমদানি জ্বালানি আমদানি তেল ইরান যুদ্ধ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
