ভোটের হাওয়া আর রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। সদ্য বিদায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৯৩৩ জন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) মঙ্গলবার (৩ মার্চ) তাদের মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে দেশে কমপক্ষে ৩৪৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছে যে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিহত ১০ জনের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির ৮ জন এবং আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের ১ জন করে কর্মী রয়েছেন।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মোট সহিংসতার বড় একটি অংশ ছিল নির্বাচন সংশ্লিষ্ট। ২৮৫টি নির্বাচনি সহিংসতায় ৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫৫৫ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, নির্বাচনি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাগুলো এই সময়ে সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও পারস্পরিক সংঘর্ষের চিত্রটিও ছিল অত্যন্ত প্রকট।
ফেব্রুয়ারি মাসে মানবাধিকারের অন্যতম বড় ক্ষত হয়ে দেখা দিয়েছে 'মব ভায়োলেন্স' বা গণপিটুনি। ৪২টি এমন ঘটনায় ১৯ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৬৩ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর এক বড় আঘাত।
রাজনৈতিক অস্থিরতার আড়ালে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার চিত্রটি আরও বেশি মর্মস্পর্শী। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৩৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৫ জন ধর্ষণের শিকার এবং ৩ জনকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৯৫ জন, যাদের মধ্যে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সীমান্ত হত্যার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, "আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, মব জাস্টিস এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।" তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক হওয়ার এবং নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।