একাত্তর জার্নালে কলকাতার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারের সঙ্গে আলাপচারিতার মুহূর্ত। ছবি: সংগৃহীত
একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বজনীন এক আবেগের নাম। তবে এই ভাষাপ্রেমের স্রোত কেবল একুশেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ১৯ মে-র শিলচর হয়ে মিশেছে কলকাতার রাজপথেও। একাত্তর জার্নালে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে কলকাতার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও তথ্যচিত্রকার সৌম্যিত্র দস্তিদার দুই বাংলার ভাষাচর্চা, হিন্দি সংস্কৃতির দাপট এবং বাংলা চলচ্চিত্রের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্যে উঠে এসেছে ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া নারী শহীদ কমলা ভট্টাচার্যের বীরত্বগাথা থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের চিত্র।
সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র দস্তিদার বলেন, “আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি এবং ১৯ মে—উভয় দিনকেই পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। ১৯৬১ সালে আসামের শিলচরে মাতৃভাষার দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে ১১ জন শহীদের মধ্যে কমলা ভট্টাচার্য নামে এক তরুণী ছিলেন। তিনি ছিলেন ভাষার জন্য আত্মদানকারী পৃথিবীর প্রথম নারী শহীদ। অথচ আক্ষেপের বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গে ৫২-র আন্দোলন নিয়ে যতটা চর্চা হয়, সেই তুলনায় ৬১-র শিলচরের ইতিহাস কিছুটা ম্লান।” তিনি আরও যোগ করেন, “ভাষা দিবসে আমরা যখন সীমান্ত অতিক্রম করি, তখন আমরা শুধুই বাঙালি। কলকাতার প্রভাতফেরি আর ছোটদের হাতে থাকা বর্ণমালা প্রমাণ করে যে, দুই তীরের বাঙালির স্পন্দন একই সূত্রে গাঁথা।”
কলকাতায় হিন্দির প্রভাবে বাংলা ভাষা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এই নির্মাতা অকপট স্বীকারোক্তি দেন। তিনি বলেন, “কলকাতার উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যে বাংলা বলার প্রবণতা কমছে, এটি আমাদের ব্যর্থতা। দক্ষিণ ভারতীয়রা যেভাবে নিজেদের ভাষাকে আগলে রাখে, আমরা তা পারিনি। তবে আশার কথা হলো, কলকাতা শহর ছাড়িয়ে আপনি যদি বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, মালদহ বা বীরভূমে যান, তবে দেখবেন সেখানে বাংলার প্রতি টান এখনো অটুট। অজস্র লিটল ম্যাগাজিন আর সাংস্কৃতিক সংগঠন সেখানে আজও ভাষাকে ইতিবাচকভাবে টিকিয়ে রেখেছে। হিন্দির এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এখন মানুষ নতুন করে রাস্তায় নামতে শুরু করেছে।”
একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বাংলার সংস্কৃতিকে সেলুলয়েডে তুলে আনার বিষয়ে সৌমিত্র দস্তিদার কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রের মতো বড় বাজেট বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে অপ্রতুল। তবে তিনি আশাবাদী তরুণদের এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে। সৌমিত্র বলেন, “বাণিজ্যিক ধারার বাইরে প্রীতীতের মতো তরুণরা বিকল্প পথে হাঁটছে। হল রিলিজের অপেক্ষায় না থেকে তারা গ্রামে গ্রামে ছবি নিয়ে যাচ্ছে। তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি নিয়ে হলগুলোতে যে অনাগ্রহ ছিল, তা কাটাতে সমান্তরাল এক নতুন চিন্তাধারা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের মতো যদি ডিস্ট্রিবিউশন আর ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানো যায়, তবে বাংলা চলচ্চিত্রের এই মলিন দশা কাটতে বাধ্য।”
সবশেষে তিনি প্রত্যাশা করেন, ভাষাকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার এই আত্মিক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধই আগামী দিনে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বিষয় : একুশে
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
