প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতার মসৃণ পটপরিবর্তন ঘটিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এটিই প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন, যেখানে দীর্ঘ দেড় দশকের একাধিপত্যের অবসান ঘটেছে। তবে রাজপথের লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসলেও তারেক রহমানের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ—বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে কক্ষপথে ফিরিয়ে আনা। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নবনির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক সাফল্য ও স্থায়িত্ব এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের ওপর।
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন বার্ষিক প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, যা বর্তমান ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত দুঃসাধ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও তা পূরণে রাজস্ব আহরণের কোনো সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা সরকারের জন্য হবে লিটমাস টেস্ট।
বর্তমানে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের প্রধান কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। টাইম ম্যাগাজিনের মতে, কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। দেশের ৫ কোটি মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে খামার থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত শক্তিশালী ও অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। খাদ্য সরবরাহ চেইন ও লজিস্টিক খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই হবে তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা।
প্রতিবেদনে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করা হয়েছে। বর্তমানে ১ কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসে কর্মরত, যাঁদের পাঠানো অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় প্রধান ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে রেমিট্যান্স ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের চেয়েও বেশি। এই প্রবাহ ধরে রাখতে অবৈধ হুন্ডি চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রম রপ্তানি খাতের দুর্নীতি নির্মূল করা নতুন প্রশাসনের জন্য অপরিহার্য।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তারেক রহমানকে অত্যন্ত সতর্কভাবে পা বাড়াতে হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তি এবং আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ চুক্তির মতো বিষয়গুলো নিয়ে জনমনে ক্ষোভ থাকলেও দিল্লির সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও সামরিক অংশীদার। ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং ড্রোন কারখানা স্থাপনের মতো প্রকল্পগুলোতে চীনের বিনিয়োগ বেইজিংকে ঢাকার অত্যন্ত কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
নির্বাচনের অব্যবহিত আগে ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ‘ঝুঁকি’ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ওয়াশিংটন মূলত সামরিক সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকাকে নিজের বলয়ে রাখতে চায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমান যদি ওয়াশিংটনকে ইতিবাচক সংকেত না দেন, তবে চীনের দিকে তাঁর ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় তারেক রহমানকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সার্ক ও আসিয়ানের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তিনি ব্যক্ত করেছেন, তার বাস্তবায়নই বলে দেবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অনুঘটক হিসেবে তিনি কতটা সফল হবেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
