৫০ কেজি ওজন বহনে সক্ষম বস্টন ডায়নামিক্সের শক্তিশালী রোবট। ছবি: বস্টন ডায়নামিক্স
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত বিলাসিতা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আশুলিয়ার পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে উত্তরের ফসলি মাঠ—সবখানেই এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া বদলে দিচ্ছে উৎপাদনের চিরচেনা চিত্র। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশ যদি দ্রুত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক বাজার ও বিদেশি বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে দেশ।
কানাডার ডালহৌসি ইউনিভার্সিটির গবেষক ও এআই বিশ্লেষক শুভ্র পালের মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন মানুষ বনাম এআইয়ের মধ্যে নয়, বরং ‘এআই জানা দেশ’ বনাম ‘এআই না জানা দেশের’ মধ্যে। তিনি বলেন, “চীন ও ভিয়েতনাম এআই ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনছে। আমরা যদি সস্তা শ্রম আর পুরনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে থাকি, তবে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।”
শুভ্র পাল আরও সতর্ক করেন যে, গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের আগে সেই দেশে প্রয়োজনীয় ‘এআই ট্যালেন্ট’ আছে কি না তা যাচাই করে। দক্ষ জনবল না থাকলে এসব বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাবে।
আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় যেখানে আগে ঘণ্টায় ১০০ ইউনিট উৎপাদন হতো, এআই ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ছোঁয়ায় এখন তা বেড়ে ৪০০ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। কারখানার ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল কুদ্দুছ জানান, এআই-চালিত ক্যামেরা দিয়ে এখন কাপড় ও সেলাইয়ের ভুল ধরা হয়, যা মানুষের চোখের চেয়েও নিখুঁত। এতে খরচ কমছে এবং পণ্যের গুণমান বাড়ছে। তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অটোমেশনের ফলে যেখানে দশজনের কাজ একজন দিয়ে সম্ভব হচ্ছে, সেখানে শ্রমিকের চাহিদা কমে যাওয়ার এবং কর্মসংস্থানের সংকট তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ম্যাকিনজি’ এবং ‘স্ট্যানফোর্ড এআই ইনডেক্স’ বলছে, বিশ্বের অধিকাংশ বড় কোম্পানি এখন এআই ব্যবহার করছে। বিপরীতে, বাংলাদেশে ৯৭ শতাংশ কোম্পানি এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হলেও দক্ষ কর্মীর অভাবে তা পারছে না। ইউনেস্কোর ২০ concert২৫ সালের সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশে এআই দক্ষতা, গবেষণা এবং ডেটা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, “আমরা একটি সমন্বিত জাতীয় এআই দক্ষতা কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাংকিং, পোশাক ও অন্যান্য খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।”
শিল্প খাতে সীমাবদ্ধতা থাকলেও কৃষিতে আশার আলো দেখাচ্ছে ‘ডা. চাষী’ অ্যাপ। প্রায় ৮৭ হাজার নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর এই অ্যাপটি ফসলের রোগ শনাক্তকরণ ও সঠিক পরিমাণে সার-কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। ‘জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের’ তথ্যমতে, এর ফলে ফসলের ফলন ১২-১৬ শতাংশ বেড়েছে এবং কীটনাশকের খরচ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতে প্রতারণা শনাক্তকরণ ও ঋণ ঝুঁকি নিরসনে এআই ব্যবহৃত হলেও মাত্র ৩২ শতাংশ ব্যাংকের এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নীতিমালা রয়েছে। অন্যদিকে, মোবাইল আর্থিক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ তাদের ই-কেওয়াইসি এবং ফ্রড শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় সফলভাবে এআই যুক্ত করেছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির করপোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির সুফল পেতে কেবল প্রযুক্তির আমদানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ডেটা ব্যাংক, দক্ষ জনবল এবং সহায়ক রাষ্ট্রীয় নীতি। এই প্রস্তুতিতে দেরি হলে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
