× প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন ফিচার প্রবাস সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

জবাবদিহির অভাব

সরকার বদলালেও সেবা খাতে কমেনি ঘুষের রাজত্ব

ন্যাশনাল ট্রিবিউন প্রতিবেদক

০৩ জুলাই ২০২৬, ২৩:২২ পিএম । আপডেটঃ ০৪ জুলাই ২০২৬, ০১:৩০ এএম

অফিসকক্ষে বসে ক্যালকুলেটরে হিসাব করে ঘুষ নিচ্ছেন পিআইও বাবুল চন্দ্র রায়। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, কিন্তু নাগরিক জীবনের নির্মম বাস্তবতা বদলায় না। পাসপোর্ট অফিস, ভূমির নামজারি, বিআরটিএ কিংবা থানা—সরকারি সেবা খাতের প্রতিটি স্তরে ঘুষের রাজত্ব এখনও বহাল। প্রশাসনিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত এই দুর্নীতি ও দালালচক্রের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

সেবা খাতে ১২,৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ: টিআইবির বিস্ফোরক তথ্য

সদ্য প্রকাশিত টিআইবির ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আগের জরিপের তুলনায় এই আর্থিক ক্ষতি ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো। এই সময়ে অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার। যা পূর্ববর্তী বছরে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।

জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘুষ দেওয়া পরিবারগুলোর ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ স্পষ্ট জানিয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে সেবা পাওয়া অসম্ভব কিংবা অত্যন্ত কঠিন হতো। অর্থাৎ, সাধারণ নাগরিকের কাছে ঘুষ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়, বরং সেবা পাওয়ার একটি অলিখিত ও বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপ্রবণ সেবার তালিকায় রয়েছে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং ভূমি অফিস। পাসপোর্ট সেবা নিতে যাওয়া ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন এবং ৭৬ শতাংশ ব্যবহারকারী সরাসরি ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। একইভাবে বিআরটিএ-তেও দুর্নীতির অভিজ্ঞতার হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

ডিজিটালাইজেশনের যুগেও এই দুর্নীতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সরাসরি যোগাযোগ। জরিপে দেখা গেছে, ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপস্থিত হয়ে সরকারি সেবা নিয়েছেন। যেখানে অনলাইনের মাধ্যমে সেবা নিয়েছেন মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে কর্মকর্তা এবং সেবাগ্রহীতার এই সরাসরি যোগাযোগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দালালচক্র ও ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি বহাল রয়েছে।

বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের ওপর করা এক পৃথক মূল্যায়নে টিআইবি কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিতকরণ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ। তবে সংস্থাটির মতে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়।

এরই মধ্যে, দুর্নীতি দমনের প্রধান চালিকাশক্তি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত মার্চে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের একযোগে পদত্যাগের পর বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকটে পড়ে। প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে কমিশনের অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন ও চার্জশিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে। যদিও নতুন নেতৃত্ব খোঁজার জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত দুদকের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

টিআইবির এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা জাতীয় সংসদেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকারি দলের সদস্যরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালীন এই ১২ হাজার কোটি টাকার ঘুষের তীব্র সমালোচনা করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেন। অপরদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ নয়। বরং মাঠপর্যায়ে নাগরিকদের দেওয়া ঘুষের সামগ্রিক চিত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গত ৩০ জুন এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন, "দুর্নীতি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এর কোনো তামাদি নেই। অন্তর্বর্তী সরকার, আওয়ামী লীগ সরকার কিংবা বর্তমান সরকার—যে সময়েরই অভিযোগ হোক না কেন, দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে এবং করা উচিত। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা থাকবে না।"

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, "সেবা খাতের দুর্নীতি বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে শাস্তির ভয় দুর্বল হয়ে পড়ায় ঘুষের প্রবণতা আরও বেড়েছিল। দুর্নীতি বন্ধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের সমান প্রয়োগ। সরকার যারই হোক। প্রশাসনের একই লোকজন যদি শাস্তির ভয় না পায়। তাহলে সেবা খাতের ঘুষ বন্ধ হবে না।"

নতুন প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা। যেখানে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক স্লোগান বা প্রতীকী ব্যয় সংকোচনের বাইরে গিয়ে বাস্তবে। কোনো অতিরিক্ত অর্থ ও হয়রানি ছাড়াই মৌলিক সরকারি সেবাগুলো নিশ্চিতভাবে পেতে পারেন।

National Tribune

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন

যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574

ই-মেইল: [email protected]

ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 National Tribune All Rights Reserved.