পাশের বাসার সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া এই অস্পষ্ট অবয়ব ও বিশেষ ‘হাঁটার ভঙ্গি’র সূত্র ধরেই দুর্ধর্ষ ঘাতক গৃহকর্মীকে শনাক্ত করেছে পিবিআই। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার উত্তরায় গৃহকর্ত্রী আয়শা আক্তারকে চেতনানাশক প্রয়োগ করে হত্যা ও সর্বস্ব লুটের ঘটনাটি ছিল এক নিরেট রহস্য। ঘাতক গৃহকর্মীর নাম-পরিচয় ছিল ভুয়া, ছিল না কোনো মুঠোফোন নম্বর, এমনকি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরাও ছিল বিকল। তদন্তকারীরা যখন কার্যত অন্ধকারের অতল গহ্বরে, তখন এক পুলিশ কর্মকর্তার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ফুটেজে ধরা পড়া নারীর বিশেষ ‘হাঁটার ভঙ্গি’ হয়ে ওঠে খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের প্রধান চাবিকাঠি। সেই সূত্র ধরেই দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ছদ্মনামে অপরাধ করে আসা দুর্ধর্ষ চোর ও খুনি বিলকিছ বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় গৃহকর্ত্রী আয়শা আক্তার (৬২) ও তাঁর স্বামী আনোয়ার হোসেনকে (৬৮) বিষাক্ত চেতনানাশক খাইয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে পালিয়ে যান সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গৃহকর্মী ‘মারুফা’। অতিরিক্ত চেতনানাশকের প্রভাবে প্রাণ হারান আয়শা আক্তার। তদন্তে নেমে পিবিআই দেখে, অভিযুক্ত নারী নিজের সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্যই দেননি। পাশের বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে একটি ঝাপসা ছায়া দেখা গেলেও মুখ চেনার কোনো উপায় ছিল না।
মামলার জট খুলতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের উপপরিদর্শক (এসআই) রবিউল ইসলামের স্মৃতিশক্তি। তিনি জানান, অস্পষ্ট ফুটেজে মুখ দেখা না গেলেও ওই নারীর হাঁটার ধরনটি তাঁর খুব পরিচিত মনে হয়। তিন বছর আগে একটি চুরির মামলায় তিনি বিলকিছ বেগম নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। সন্দেহ দানা বাঁধলে তিনি রেকর্ড রুম থেকে পুরোনো নথি ও গুগল ড্রাইভে সংরক্ষিত ছবি মিলিয়ে দেখেন। এরপর ছবি নিয়ে নিহতের পরিবারের কাছে গেলে তাঁরা নিশ্চিত করেন যে, ‘মারুফা’ পরিচয়ে কাজে আসা নারীটিই আসলে বিলকিছ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ৪৩ বছর বয়সী বিলকিছ বেগম গত এক যুগ ধরে ঢাকা ও এর আশপাশে একই কায়দায় অপরাধ করে আসছেন। তিনি কখনো ‘কণা’, কখনো ‘নূরজাহান’ বা ‘মমতাজ’ সেজে বাসাবাড়িতে কাজ নেন। বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য শুরুতে এনআইডি বা মুঠোফোন নম্বর না দেওয়ার অজুহাত তৈরি করেন। এরপর সুযোগ বুঝে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে সবাইকে অচেতন করে লুটপাট চালান। তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানীতে অন্তত পাঁচটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালেও তিনি একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আবারও একই নেশায় মেতে ওঠেন। এবার তাঁর লালসা কেড়ে নিল এক নিরপরাধ গৃহকর্ত্রীর প্রাণ।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নানের তত্ত্বাবধানে গত ২১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর থেকে বিলকিছকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি নিজের অপরাধ কবুল করেছেন। যান্ত্রিক প্রযুক্তির যুগে একজন পুলিশ কর্মকর্তার মানবিক পর্যবেক্ষণ কীভাবে একটি নিশ্ছিদ্র অপরাধের রহস্য ভেদ করতে পারে, এই ঘটনা তারই এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
বিষয় : হত্যা অপরাধ রাজধানী ঢাকা বিশেষ সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
