আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ১৩ জন সামরিক কর্মকর্তার ভার্চুয়ালি (ভার্চ্যুয়ালি) হাজিরা দেওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল সুস্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন, "যেখানে সাবেক প্রধান বিচারপতি সশরীরে হাজির হচ্ছেন, সেখানে সেনা কর্মকর্তাদের জন্য ছাড় কেন? আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।"
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আজ (রোববার) এই মন্তব্য করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে আসামিপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে আরও বলা হয়, "অসুবিধা অনুভব করলে সরকারকে মামলা উঠিয়ে নিতে বলেন।"
তবে সেনা কর্মকর্তাদের ভার্চুয়ালি হাজিরার আবেদনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশ দেননি। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ৩ ডিসেম্বর।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আসামিরা ভার্চুয়ালি হাজিরা দিতে চেয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, "দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি কারাগারে আছেন, তাঁকে সশরীরে হাজির হতে হয়। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারক, সাবেক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, বিভিন্ন পর্যায়ের আসামিরা নিয়মিত সশরীরে হাজিরা দেন। এখানে ভিন্ন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যে কারণে বিশেষ বিবেচনায় কাউকে ভার্চুয়ালি হাজিরা দেওয়ার অনুমোদন দিতে হবে। ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।"
চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষের আবেদন শুনবেন।

গুমের ঘটনায় পৃথক দুই মামলায় সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ১৩ কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রোববার ট্রাইব্যুনাল ভবনে। ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম-নির্যাতনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলায় সাবেক ও বর্তমান ২৩ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন আসামি। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন গ্রেপ্তার আছেন এবং বাকিরা পলাতক।
গ্রেপ্তার সেনা কর্মকর্তাদের হাজিরা উপলক্ষে আজ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সেনা, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএন সদস্যদের সতর্ক পাহারায় তাঁদের সকাল ১০টায় আনা হয় এবং বেলা ১১টার দিকে ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়। ট্রাইব্যুনাল বসেন ১১টা ২০ মিনিটে।
১. টিএফআই সেলের মামলা
মামলা: টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা।
আসামি: ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন।
গ্রেপ্তার: ১০ জন সেনা কর্মকর্তা। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহাবুব আলম ও কে এম আজাদ; কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে); লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও মো. সারওয়ার বিন কাশেম।
পলাতক: শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ৭ জন।
পরবর্তী তারিখ: আগামী ৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
২. জেআইসি-এর মামলা
মামলা: জেআইসিতে গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলা।
আসামি: শেখ হাসিনাসহ মোট ১৩ জন।
গ্রেপ্তার: ৩ জন—প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
পলাতক: শেখ হাসিনা, তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১০ জন।
পরবর্তী তারিখ: আগামী ৭ ডিসেম্বর এ মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হবে।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি-বিচারকদের নিয়ে অবমাননাকর ও ব্যঙ্গাত্মক সব ধরনের ছবি, লেখা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনকে (বিটিআরসি) এই নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, তাঁদের নজরে এসেছে যে বিচারকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমে মনগড়া ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অবমাননাকর, অপমানজনক, তাচ্ছিল্যপূর্ণ ছবি, তথ্য, মন্তব্য, বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ধরনের গণমাধ্যম থেকে সরাতে হবে। ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি, মর্যাদা ও সম্মানের ক্ষতি না করে এবং আইন লঙ্ঘন না করে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার কথাও বলেন ট্রাইব্যুনাল।
অবমাননাকর ও ব্যঙ্গাত্মক এসব ভিডিও, ছবি ও লেখা অপসারণ করে আগামী ৩ ডিসেম্বর বিটিআরসির চেয়ারম্যান ও তথ্যসচিবকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর বোন ও আইনজীবী নাজনীন নাহার। তিনি অভিযোগ করেন, তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত ছিলেন এবং জিয়াউলকে হুমকি দেন।
জবাবে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ ফলপ্রসূ করার জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা যাঁকে প্রয়োজন মনে করবেন, তাঁকেই পাশে রাখতে পারবেন। ভুক্তভোগীর মুখোমুখি হলে আসামি সত্য বলতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর নাজনীন নাহারের উদ্দেশে মন্তব্য করেন যে 'আপনাকেও (নাজনীন) আসামি করা হতে পারে', যার প্রতিবাদ করেন নাজনীন। চিফ প্রসিকিউটর আরও দাবি করেন, জিয়াউল একাই প্রায় এক হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন।
এদিকে, জিয়াউল আহসানের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের চেষ্টা করছেন তাঁর আইনজীবী নাজনীন নাহার। প্রচলিত আইন মেনে এ সংক্রান্ত আবেদন প্রক্রিয়া করার জন্য জেল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট জায়গায় সই নেওয়ার অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনাল।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আনোয়ার হোসেন নবীন
যোগাযোগ: +880244809006
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2025 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
