নির্বাচনী প্রচারসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় সাবেক রিপাবলিকান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হামলার শিকার হওয়ার খবর শিরোনাম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী সব গণমাধ্যমগুলোতে।
এফবিআই ইতোমধ্যেই জানিয়েছে যে, গুলির ঘটনা ছিলো ট্রাম্পকে ‘হত্যার চেষ্ট।’ বিশ্বনেতারা এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন খোদ এ হামলাকে বলেছেন, ‘মানসিক অসুস্থতা’। মার্কিনিরা হামলার ঘটনায় হয়েছে স্তম্ভিত। ট্রাম্পকে হত্যার এ চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘ভয়াবহ মুহূর্ত’।
প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সহিংসতার যে মারাত্মক হুমকি বিরাজ করছে তাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিশপ্ত রাজনৈতিক সহিংসতার পটভূমিতে নতুন এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে এর মধ্য দিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা সেয়া ৬টার দিকে পেনসিলভেইনিয়ায় নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্পের ওপর গুলি ছোড়েন এক হামলাকারী। গুলিতে ট্রাম্পের ডান কান ছুয়ে বেরিয়ে যায় গুলি।
নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নের বাকী মাত্র আর কয়েকদিন। এমন একটি সময়ে নির্বাচনি প্রচার সভায় সাবেক এক প্রেসিডেন্টকে হত্যার এই চেষ্টা গণতন্ত্র এবং প্রতিটি আমেরিকানের তাদের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকারের ওপর আঘাত।
গুলিতে প্রচার সভায় উপস্থিত ট্রাম্পের এক সমর্থকও মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরও দু’জন। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারকেই যেন তছনছ করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিদে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার যে ধারণা গত কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে সেটি নাটকীয়ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। ১৯৮১ সালে গুলিতে রোনাল্ড রিগ্যান গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কোন প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ওপর এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি।
ট্রাম্পের ওপর আজকের হামলার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধশতাব্দী আগের সেই কালো অধ্যায় যখন কেনেডি ভাতৃদ্বয়-যাদের একজন ছিলেন প্রেসিডেন্ট, আর অপরজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আতাতীয়র গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছিলেন মার্টিন লুথার কিং এর মতো বেশ কিছু নাগরিক অধিকার নেতাও।
আজকের মতো ১৯৬০ এর দশকেও দেখা গিয়েছিল গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ত্রুটিপূর্ণ কার্যক্রম। এরকম মেরুকরণ এবং ত্রুটিপূর্ণ ক্রিয়াকলাপের আবহেই দেখা যায় রাজনৈতিক সহিংসতা। আর আগ্নেয়াস্ত্র কোন ব্যক্তির ইচ্ছায় ব্যবহার হলে তা ইতিহাসের গতি প্রকৃতিও পাল্টে দিতে পারে।
ট্রাম্প বর্তমানে প্রেসিডেন্ট না হলেও তার ওপর হামলা এ চিত্রই সামনে নিয়ে এসেছে যে, এই পদটিকে ঘিরে সবসময়ই হুমকি আছে। বিশেষ করে তাদের জন্য যারা এই পদের দাবিদার। আততায়ীর গুলিতে এর আগে নিহত হয়েছেন জন এফ কেনেডিসহ চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এরপরের ৪০ বছরে অনেকেই ধারণা করে নিয়েছিলেন যে, সিক্রেট সার্ভিস বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের ঘটনার পুনরুবৃত্তির সম্ভাবনা অনেকখানি কমিয়ে এনেছেন। কিন্তু তখন থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা আসলে বন্ধই হয়নি। ২০১১ সালে তৎকালীন অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট গ্যাব্রিয়েলে গিফোর্ডস গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই হামলার ঘটনায় মারাও গিয়েছিল ৬ জন।
আবার ২০১৭ সালে রিপাবলিকান এক কংগ্রেস সদস্যর ওপর হামলা হয়। তখনকার হাউজ মেজোরিটি হুইপ এবং অন্য আরও তিনজনের ওপর গুলি চলেছিল। এরপর দেখা যায়, ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা। যেটা ঘটিয়েছিল ট্রাম্পের সমর্থকরা।
আর এবার হল খোদ ট্রাম্পের ওপর হামলা। এ ঘটনার পর প্রচার সভার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। যদিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আদৌ ট্রাম্পের প্রচাসভার নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল ছিল না।
কারণ তাদের ওই সভায় ঢোকার জন্য অন্তত দু’ঘণ্টার তল্লাশি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। সামান্য ব্যাগও সঙ্গে নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও কী ভাবে নিরাপত্তারক্ষীদের এড়িয়ে ট্রাম্পের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন হামলাকারী, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে।
শনিবারের এই ঘটনার প্রভাব আমেরিকা এবং এর রাজনৈতিক গতি প্রকৃতির ওপর কতটা হবে তা অনুমান করা কঠিন। শনিবারের ঘটনার পর এরই মধ্যে দুই রাজনৈতিক দলের আজেবাজে কথা বলা কমানো এবং জাতীয় ঐক্যের ডাক এসেছে।
হামলার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ডেলাওয়ারে ক্যামেরার সামনে হাজির হয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমেরিকায় এ ধরনের সহিংসতার কোনও স্থান নেই।” পরে সাবেক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনেও কথা বলেন বাইডেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশক ধরে বেড়ে ওঠা দ্বিদ্বলীয় যে কোন্দল ঘোট পাকিয়ে উঠেছে সহিংসতার ঘটনাটি সেই ধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিছু রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ ট্রাম্পের ওপর হামলার জন্য খোদ বাইডেন ও তার দলের ডেমোক্র্যাটদের দোষারোপ করেছেন, যে ডেমোক্র্যাটরা অতীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমেরিকার গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসাবেই উল্লেখ করে এসেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার তালিকায় থাকা ওহাইওর সিনেটর জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাইডেনের দিকে তীর ছুঁড়ে পোস্ট করেন।
তিনি বলেন, 'বাইডেনের প্রচারাভিযানের মূল ভিত্তি হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদী, যাকে যে কোনও মূল্যে থামাতে হবে।" এ ধরনের কথাবার্তা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হত্যা প্রচেষ্টার দিকেই ইঙ্গিত করে।
ট্রাম্পের প্রচারণা ব্যবস্থাপক ক্রিস লাসিভিটা বলেন, বামপন্থি কর্মী, ডেমোক্র্যাট দাতারা এবং বাইডেনকেও নভেম্বরে ব্যালট বাক্সে জবাবদিহি করতে হবে তার অযাচিত মন্তব্যর জন্য। বাইডেনের প্রচার শিবিরের বাড়াবাড়ির ফলেই শনিবার ট্রাম্পের ওপর হামলা হয়েছে বলে মনে করেন লাসিভিটা।
ডেমোক্র্যাটরা হয়ত এমন অভিযোগে অপত্তি জানাবে। কিন্তু ২০১১ সালে অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য গ্যাবি গিফোর্ডের ওপর গুলির ঘটনার সময় ডেমোক্র্যাটরাও রিপাবলিকানদেরকে একই ভাষায় দায়ী করেছিল।
পেনসিলভেইনিয়ার সহিংসতার ঘটনা নিঃসন্দেহেই সোমবার থেকে শুরু হওয়া রিপাবলিকান কনভেনশনে দীর্ঘ প্রভাব ফেলবে। নিরাপত্তা প্রোটোকল আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি অপ্রীতিকর কোনওকিছু ঘটার এক নতুন পূর্বাভাস নিয়ে কনভেনস্থলের কাছে বিক্ষোভ পাল্টা বিক্ষোভও দেখা যেতে পারে।
সামনের দিনগুলোতে দুই দলের লড়াইটা আরও কুৎসিত হয়ে উঠতে পারে, যা নির্বাচনি প্রচারণার ধরনই বদলে দিতে পারে।
আগামী বৃহস্পতিবার রাতে রিপাবলিকান কনভেনশনে দলের মনোনীত প্রার্থী মঞ্চে উঠলে তার ওপর জাতীয়ভাবে জ্বলজ্বল করবে স্পটলাইট।
হামলার পর মুখে রক্ত নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্পের মুষ্টিবদ্ধ হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরার যেসব ছবি এসেছে সেগুলো মিলওয়াকির সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে তা নিশ্চিত। এসব ছবি যে কেবল ইতিহাস রচনা করেছে তাই নয়, বরং এগুলো নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হিসেব নিকেশ পাল্টে দিতে পারে।
রিপাবলিকানরা যে থিম নিয়ে নির্বাচনি প্রচারের পরিকল্পনা করছে শনিবার ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনাটি তাতে নতুন শক্তি সঞ্চার করতে পারে।
গুলিবর্ষণের ঘটনার পর ট্রাম্পের ছেলে এরিক বাবার একটি ছবি দিয়ে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন "এই যোদ্ধাকেই আমেরিকানদের প্রয়োজন!”
ট্রাম্পের সমাবেশের নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনার জন্য মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসকেও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মুখে পড়তে হবে। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এরই মধ্যে বলেছেন, তিনি পূর্ণ তদন্ত পরিচালনা করবেন। এ তদন্তে সময় লাগবে।
তবে এতসবকিছুর মধ্যে এ মুহূর্তে একটি বিষয়ই পরিষ্কার- আর তা হল, নির্বাচনি জল গড়ানোর এই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নতুন এক প্রাণঘাতী মোড় নিয়েছে।
সূত্র, বিবিসি/সিএনএন
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
