উপসাগরীয় দেশ কাতারে রয়েছে বগু গগনচুম্বী অট্টালিকা
কাতার এখন বিশ্বে একটি পরিচিত নাম। এক সময়ের ছোট অপরিচিত উপসাগরীয় রাজতন্ত্র থেকে দেশটি আজ সারা বিশ্বে নানাক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে। কাতারের বর্তমান রাজতন্ত্রের পরিবার গত ১৩০ বছর যাবত দেশটি শাসন ক্ষমতায়। শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি কাতারের আমির হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ২০১৩ সালে। শেখ তামিম যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩৩ বছর।
মধ্যপ্রাচ্য-ভিত্তিক লেখক মেশি কোয়েন মেশি কোয়েন-এর মতে, ছোট্ট এই আমিরাতকে তিনি ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার হাউজ বানিয়েছেন। কাতারের রাজধানী দোহাকে অনেকে মধ্যপ্রাচ্যের জেনেভা হিসেবেও বর্ণনা করেন। বর্তমান আমির শেখ তামিম ব্রিটেনের রয়্যাল মিলিটারি কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে কাতারের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তাকে মনোনীত করা হয় ২০০৩ সালে। তিনি সামরিক বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার অব চিফ ছিলেন এবং আরও কিছু সরকারি সংস্থায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সুপ্রিম এডুকেশন কাউন্সিল, সুপ্রিম কাউন্সিল অব হেলথ, সুপ্রিম কাউন্সিল অব এনভায়রনমেন্ট, ন্যাচারাল রিজার্ভস।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- কাতারের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা ঠিক করার জন্য ২০০৮ সালে গঠন করা হয়েছিল কাতার ‘ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০’। এই পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য যে সুপ্রিম কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেটির নেতৃত্বে ছিলেন শেখ তামিম। তার বাবার রেখে যাওয়া পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন বর্তমান আমির। যেহেতু তার বাবা আমির থাকার সময় সেসব ভিশন ঠিক করেছিলেন সেগুলোর সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন শেখ তামিম। আমির হিসেব অধিষ্ঠিত হওয়ার এক বছর পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে এক বক্তৃতায় তিনি নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, কাতার গ্যাস ও তেল বিক্রির নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসতে চায়।
শেখ তামিম বলেন, আমরা ধনী দেশে সেটা ঠিক। কিন্তু আমরা কিভাবে এ পর্যায়ে এসেছি সেদিকেও ফিরে তাকানো দরকার। ১৯৯০ এর দশকে আমার বাবা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি মাত্র আট ডলার। রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কঠিন হতো তখন। তিনি বলেন, একটা সময় আসবে যখন আমরা তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারবো না। সেটা আমরা জানি। এটা হয়তো এতো দ্রুত হবে না। কবে হবে সেটা জানি না। এজন্য আমরা নানা খাতে বিনিয়োগ করছি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হচ্ছে শিক্ষা খাতে। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য মতে, ২০২১ সালে কাতার শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করেছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। কাতারে যেসব খাত বেশ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে তার মধ্যে শিক্ষা খাত অন্যতম।
কূটনীতিক সাফল্য: যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির বার্কলে সেন্টারের গবেষক ডেভিড বি. রবার্টস লিখেছেন, বর্তমান আমিরের বাবা হামাদ বিন খলিফা আল থানি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তিনি চেয়েছিলেন কাতারকে আমেরিকার প্রভাব থেকে বাইরে নিয়ে আসতে। তিনি চাননি কাতার আমেরিকার দ্বারা পরিচালিত হোক। কাতার শুধু ইসলামপন্থী গ্রুপগুলোকে আশ্রয় দেয়নি, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ঘাটি আছে কাতারে। মধ্যপ্রাচ্যে একটি সক্রিয় এবং প্রভাবশালী দেশ হিসেবে কাতারের আবির্ভাব হয় ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে। বর্তমান আমিরের বাবা শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি তখন ক্ষমতায় ছিলেন।
লেবানন সংকট: পর্যবেক্ষকদের মতে কূটনীতির ক্ষেত্রে কাতার প্রথমে সাফল্য দেখিয়েছে লেবাননের সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে। কাতারের মধ্যস্থতায় লেবাননের বিবদমান পক্ষগুলো আলোচনার টেবিলে বসে বিরোধ মীমাংসা করতে রাজি হয়। টার্কিশ জার্নাল অব মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজে তুরস্কের বিশ্লেষক এসরা কেভুসোগ্লু লিখেছেন - কূটনীতিক ক্ষেত্রে কাতারের বড় সাফল্য আসে ২০০৮ সালে, যখন কাতারের মধ্যস্থতায় লেবাননে হেজবুল্লাহ এবং অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। এর ফলে লেবাননে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। এর আগে আরব লীগ, জাতিসংঘ এবং ফ্রান্স মধ্যস্থতা করে ব্যর্থ হয়েছিল।
আফগানিস্তান সংকট: আফগানিস্তানের তালেবান ২০১৩ সালে দোহায় তাদের কূটনীতিক অফিস খোলে। সেই অফিস চালুর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সম্মতি ছিল। এর ফলে বেশ দ্রুত তালেবান শীর্ষ নেতাদের দোহায় যাতায়াত বাড়ে। অন্যদিকে আমেরিকার কূটনৈতিকরাও কাতারে আসতে থাকে। এর ফলে তালেবানের সাথে আমেরিকার কর্মকর্তাদের মধ্যস্থতা করার সুযোগ পায়। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সৈন্য সরিয়ে নেবার সময় আবারো কাতারের ভূমিকা সামনে আসে। আফগানিস্তান থেকে যেসব আমেরিকান এবং আফগান নাগরিক সরিয়ে নেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক আশ্রয় পেয়েছিল কাতারে। তখন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কাতারের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। বর্তমানে তালেবানের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করছে কাতার।
হামাসের সাথে বন্ধুত্ব: ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস-এর শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যেই কাতারে অবস্থান করছেন। কাতারের সাথে হামাস নেতাদের সুসম্পর্কের কথা সবারই জানা। বিভিন্ন সময় ইসরায়েলের সাথে হামাসকে আলোচনার টেবিলে আনার ক্ষেত্রে কাতার গুরুত্বপূর্ণ রেখেছে। সর্বশেষ গাজায় ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হবার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল কাতার। ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে যে পরোক্ষ যোগাযোগ হয় সেখানেও কাতারের ভূমিকা রয়েছে।
কাতারের ব্র্যান্ডিং তৈরি: বিশ্বে প্রভাব ও পরিচিতি বাড়ানোর জন্য কাতার দেশ হিসেবে তাদের ব্র্যান্ডিং তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল নানা ক্ষেত্রে। কাতার তাদের ব্র্যান্ড তৈরির যে উদ্যোগ নিয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আল-জাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে কাতার আঞ্চলিক প্রভাব তৈরির পাশাপাশি বিশ্বে তাদের পরিচিতি বাড়িয়েছে। তাছাড়া কাতার এয়ারওয়েজ এবং বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করাও ছিল কাতারের ব্র্যান্ডিং তৈরির পদক্ষেপ। কাতার ব্র্যান্ডিং-এর সবচেয়ে বড় আযোজন ছিল বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
