দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচিতে যন্তর মন্তরে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। ছবি: সংগৃহীত
ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তরুণ-তরুণীদের অভূতপূর্ব রাজপথ দখল এবং সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা দেশটির মোদি সরকারের সামনে এক বিশাল রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তরে গণদাবি আদায়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর এই অদম্য অবস্থান এবং পুলিশের টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে সারাদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কেন্দ্রের জন্য এক ‘বিপদঘণ্টা’ হিসেবে দেখছেন।
সোমবার (২০ জুলাই) দিল্লির কনট প্লেস থেকে শুরু করে যন্তর মন্তর পর্যন্ত পুরো এলাকা হাজার হাজার ক্ষুব্ধ তরুণের উপস্থিতি ও স্লোগানে রণক্ষেত্রে রূপ নেয়।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল নয়। বরং এটি তরুণ ও শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত একটি নতুন ধারার নাগরিক আন্দোলন। মাত্র দুই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে ফলোয়ার সংখ্যার দিক থেকে টেক্কা দিয়ে আলোচনায় আসা এই সংগঠনটি তাদের এক মাসের অবস্থান কর্মসূচিকে এবার বড় ধরনের রাজপথের আন্দোলনে রূপ দিল।
সোমবার সকালে দিল্লির একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং কঠোর ব্যারিকেড সত্ত্বেও হাজার হাজার কলেজ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী যন্তর মন্তরে জড়ো হন। আন্দোলনের সমর্থক ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ধরনাস্থল বলেন, "আজ যন্তর মন্তরে আমি যে নতুন প্রজন্মকে দেখছি, তা আমার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। এই তরুণেরা শুধু নিজেদের জন্য লড়ছে না। তারা একটি সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এমন রাজনীতির জন্য লড়ছে যা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।"
সোমবারে শিক্ষার্থীদের এই জনস্রোত সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার আলোচনার উদ্যোগ নেয়। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার একটি ছবি প্রকাশ করে জানান, বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তাদের দীর্ঘ মৌখিক আলোচনা হয়েছে এবং বিকেল চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
তবে সিজেপির মূল দাবি—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার—মানতে রাজি হয়নি সরকার। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে রাজপথ ছেড়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার অনুরোধ করা হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছেন।
গত এক মাস ধরে এই যুব আন্দোলনের ওপর নজর রাখা স্বাধীন সাংবাদিক স্মিতা শর্মার মতে, শিক্ষার্থীরা কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তাদের এই লড়াইয়ের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতির মতো গভীর অর্থনৈতিক সংকট অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তিনি বলেন, "ইন্টারনেট ও মেট্রো বন্ধ থাকার পরও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে লাঠিচার্জের মুখে বারবার ফিরে এসেছে, তা সরকারের জন্য একটি বড় বার্তা। জনগণের ক্ষোভ আজ বেলুনের মতো ফেটে পড়েছে। সরকার যদি এটি উপেক্ষা করে। তবে তা হবে তাদের বড় ভুল।"
একই সুর প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত অত্রির কণ্ঠেও। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনীতিতে বিভাজনের কৌশলের চেয়ে দেশের কর্মসংস্থান ও গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়গুলোই এখন প্রধান হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, দিল্লির রাজপথে যা দেখা গেছে তা ভারতীয় গণতন্ত্রের শিকড় কতটা মজবুত তারই প্রমাণ।
সোমবারের এই ঘটনার পর মঙ্গলবারই প্রধান বিরোধী দলগুলো শিক্ষার্থীদের সমর্থনে মোদির বাসভবনের সামনে ধরনায় বসে গণগ্রেপ্তার বরণ করে। যা চলমান এই আন্দোলনের মাত্রা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে এভাবে দীর্ঘ সময় উপেক্ষা করা বা কেবল পুলিশি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমানো মোদি সরকারের জন্য কঠিন হবে। রাজপথের এই যুব-বিক্ষোভ আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতিতে একটি বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
