জর্ডানে নিহত দুই সেনার পরিচয় প্রকাশ করেনি। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর জর্ডানে ইরানের আকস্মিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আরও একজন। স্থানীয় সময় শুক্রবারের এই প্রাণঘাতী হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শনিবার রাতে ইরানের ওপর পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তেহরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা এবং ওয়াশিংটনের বন্দর অবরোধের জেরে চরম উত্তেজনার মধ্যেই জর্ডানের সামরিক ঘাঁটিতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটল। এর ফলে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিল।
শনিবার রাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) টানা অষ্টম রাতের মতো ইরানের ওপর বিমান হামলা পরিচালনা করেছে।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, জর্ডানে মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর হামলা চালানো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) বাহিনীকে দ্রুত শাস্তি দেওয়াই ছিল এই তাৎক্ষণিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করার ফরাসি বা আন্তর্জাতিক স্তরের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ইরানের সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে এই হামলা চালানো হয়েছে। জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলার সময় আরও ৪ মার্কিন সেনা আহত হলেও চিকিৎসার পর তারা কাজে ফিরেছেন। নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, "বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে।"
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, শনিবার ভোরের হামলায় জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিতে অন্তত দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে আইআরজিসি। তবে এ দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সেন্টকম।
শনিবার গভীর রাতে এক লিখিত বিবৃতিতে মার্কিন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের বারবার চুক্তি লঙ্ঘন একটি মৌলিক সত্যকে স্পষ্ট করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।"
খামেনি আরও বলেন, ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য 'ভুলে যাওয়ার মতো নয় এমন শিক্ষা' অপেক্ষা করছে।
গত জুন মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি প্রাথমিক চুক্তি গত ৮ই জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের 'চুক্তি শেষ' ঘোষণার মাধ্যমে মুখ থুবড়ে পড়ে। এরপর চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলে তেহরান বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে এবং একটি জাহাজ সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার বড় অংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, গত তিন সপ্তাহে মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরান কর্তৃক উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার জেরে কুয়েতের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরব, কুয়েতসহ ছয় দেশের জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্পষ্ট 'যুদ্ধাপরাধ'।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শনিবার পৃথক এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ও বিশ্বজুড়ে থাকা তাদের নাগরিকদের জন্য জরুরি ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। যেকোনো সময় অপ্রত্যাশিতভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে বলে ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে। ভূরাজনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসন এবং দুই পরাশক্তির সামরিক সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ না হলে, এই আঞ্চলিক যুদ্ধ দ্রুত একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামরিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
