যেখানে বিভিন্ন সময়ে লুইজিয়ানা, ক্যালিফোর্নিয়া, আলাস্কা ও ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ ক্রয়ের মাধ্যমে বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আর্কটিক অঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড কেনার বিশেষ আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণের অতীত ইতিহাস। ইতিহাসবিদদের মতে, নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিকানা’ পাওয়ার এই ট্রাম্পীয় আকাঙ্ক্ষা মূলত বিগত দুই শতক ধরে ওয়াশিংটনের অনুসৃত ‘ভূমি কেনার মাধ্যমে ভূখণ্ড সম্প্রসারণ’ নীতিরই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জে সেক্সটনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, "গ্রিনল্যান্ডের মতোই, অতীতে ওয়াশিংটন দাবি করেছিল যে, এসব অঞ্চল অন্য শক্তির হাতে চলে যাওয়ার আগেই তাদের দখলে নেওয়া প্রয়োজন"। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বলপ্রয়োগ না করে ‘তাৎক্ষণিক আলোচনা’র মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের ইঙ্গিত দিলেও, অতীতে ওয়াশিংটন কখনো কূটনৈতিক দরকষাকষিতে, আবার কখনো ‘বন্দুকের মুখে’ বিশাল সব ভূখণ্ড কিনে আজকের বর্তমান মানচিত্র তৈরি করেছে।
লুইজিয়ানা ক্রয় (১৮০৩): আয়তন দ্বিগুণ করার ঐতিহাসিক চাল
১৮০৩ সালে ফরাসি নেতা নেপোলিয়ান বোনাপার্টের কাছ থেকে লুইজিয়ানা ভূখণ্ড কেনার মাধ্যমে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। হাইতি দ্বীপে দাস বিদ্রোহ এবং ব্রিটেনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের মুখে ফ্রান্স তাদের উত্তর আমেরিকার এই বিশাল ভূখণ্ডটি বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
তৎকালীন ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার (বর্তমান মূল্যে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি) মূল্যের এই চুক্তির মাধ্যমে ২০ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। যা নবগঠিত রাষ্ট্রটির আয়তন রাতারাতি দ্বিগুণ করে দেয় এবং দেশটিকে একটি মহাদেশীয় মহাশক্তি হওয়ার পথে এগিয়ে নেয়।
মেক্সিকোর স্বত্বত্যাগ ও লা মেসিলা ক্রয় (১৮৪৮-১৮৫৩)
১৮৪০-এর দশকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ বা পূর্বনির্ধারিত নিয়তিতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে মার্কিন জনগণ। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস কে পোল্ক মেক্সিকোর অংশ এবং এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য লোভনীয় গভীর সমুদ্রবন্দরসমৃদ্ধ ক্যালিফোর্নিয়ার ওপর বিশেষ নজর দেন। ১৮৪৬ সালে মেক্সিকোর সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধার পর আমেরিকার বিজয়ের মাধ্যমে ১৮৪৮ সালে ‘গুয়াদালুপ হিডালগো’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ইতিহাসবিদ জে সেক্সটনের ভাষায়, এটি ছিল "বন্দুকের মুখে বিক্রি করা" ভূখণ্ড। ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিনিময়ে ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাডাসহ প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্র। এর ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৮৫৩ সালে আন্তঃমহাদেশীয় রেলপথ নির্মাণ ও মেক্সিকোর অর্থনৈতিক সংকটের সুযোগে ১ কোটি ডলারের বিনিময়ে ‘লা মেসিলা’ (গ্যাডসডেন ক্রয়) চুক্তির মাধ্যমে আরও ৭৬ হাজার ৯০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি কিনে বর্তমান দক্ষিণ সীমান্ত চূড়ান্ত করে ওয়াশিংটন।
আলাস্কা ক্রয় (১৮৬৭) 'সিওয়ার্ডের বোকামি' থেকে তেলের খনি
১৮৬৭ সালে রুশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে ১৫ লাখ ৫৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের আর্কটিক ভূখণ্ড আলাস্কা মাত্র ৭২ লাখ ডলারে (বর্তমান মূল্যে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার) কিনে নেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সিওয়ার্ড। রাশিয়ার কাছে বোঝা এবং যুক্তরাজ্যের হামলার ঝুঁকিতে থাকা এই ভূমি ক্রয়ের সিদ্ধান্তকে তখন মার্কিনরা ব্যঙ্গ করে ‘সিওয়ার্ডের বোকামি’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
"সিওয়ার্ড বিশ্বাস করতেন, এই ভূমির কৌশলগত মূল্য অনেক, যা ব্রিটিশদের উত্তর আমেরিকায় হস্তক্ষেপ করা থেকে নিরুৎসাহিত করবে।"
পরবর্তী সময়ে আলাস্কায় বিপুল সোনা ও তেলের খনি আবিষ্কার এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময় এর সামরিক গুরুত্ব সিওয়ার্ডের এই দূরদর্শী বিনিয়োগকে সার্থক প্রমাণ করে।
ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ (১৯১৭) ডেনমার্কের ওপর মার্কিন মনস্তাত্ত্বিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র সবশেষ ভূখণ্ডটি কেনে ১৯১৭ সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে, যা তখন ‘ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ নামে পরিচিত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সাবমেরিনের হুমকি এবং জার্মানি কর্তৃক ডেনমার্ক আক্রমণের আশঙ্কায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেন্ট থমাস বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যমতে, ডেনমার্ক বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানালে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপগুলো জোরপূর্বক দখল করার সতর্কবার্তা দিয়েছিল।
ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যাস্ট্রিড অ্যান্ডারসেন বলেন, "এখানে আজ আমরা গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কে যা শুনছি তার প্রতিধ্বনি রয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র মূলত যা বলতে এসেছিল তা ছিল— 'হয় তুমি এটা আমাদের কাছে বিক্রি করবে, নয়তো আমরা আক্রমণ করব'"। পরিশেষে, ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের (বর্তমান মূল্যে ৬৩ কোটি ডলার) বিনিময়ে ক্যারিবীয় দ্বীপগুলো কিনে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
ভূখণ্ড ক্রয়ের এই সুদীর্ঘ ইতিহাস প্রমাণ করে যে, আজকের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক মানচিত্রটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং তা শতবর্ষের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ও সামরিক কূটনীতিরই এক চূড়ান্ত রূপ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
