ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরা রাজ্যে ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি শপিং সেন্টারের বিশাল ধ্বংসস্তূপের মাঝে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ও প্রশিক্ষিত কুকুরের সহায়তায় জীবিতদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: রয়টার্স
লাতিন আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ৯২০ জন ছাড়িয়েছে। শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও এর পরবর্তী ২১৪টি আফটারশকের (পরাঘাত) কারণে রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের হাসপাতাল, শপিং সেন্টারসহ সহস্রাধিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রবিবার (২৮ জুন) পর্যন্ত প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৩৬০ জন এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং সড়কসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রাথমিক উদ্ধারকাজ ব্যাহত হলেও আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী দলের সহায়তায় ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে এখনো তীব্র তৎপরতা চলছে।
বুধবারের এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা। যেখানে দেশটির প্রধান বিমানবন্দর ও দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দরের একটি অবস্থিত। লা গুয়াইরার ধসে পড়া একটি শপিং সেন্টারের সামনে অপেক্ষমাণ বাসিন্দা নাতাচা দিয়াজ তাঁর ২২ ও ২৩ বছর বয়সী দুই মেয়ের জীবনের আশঙ্কায় ব্যাকুল হয়ে বিবিসিকে বলেন, "আমি শুধু আমার মেয়েদের আবার আমার কাছে ফিরে পেতে চাই। ওরাই আমার সবকিছু, দয়া করে ওদের ফিরিয়ে আনুন।" এমন চরম উৎকণ্ঠার মাঝেই লা গুয়াইরা থেকে তিন সহোদর শিশুকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে মানুষের মনোবল কিছুটা ধরে রেখেছে।
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, "শুধু লা গুয়াইরা অঞ্চলেই অন্তত ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ১৭২ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।" অন্যদিকে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ভেনেজুয়েলার ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের ওপর এই দুর্যোগ মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর ভয়াবহ সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে চিকিৎসক পেদ্রো হাভিয়েল ফার্নান্দেজ বলেন, "আমাদের সব হাসপাতালেই সাধারণ দিনেও ওষুধ ও চিকিৎসা-সরঞ্জামের অভাব থাকে। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর জরুরি পরিস্থিতি সামলানো আমাদের জন্য অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।"
দুর্যোগের আন্তর্জাতিক ভয়াবহতা স্পষ্ট করে স্পেন, পর্তুগাল ও ব্রাজিল সরকার তাদের নাগরিকদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। কেবল স্পেনেরই ১০৬ জন নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। চলমান উদ্ধার অভিযানে সংহতি জানিয়ে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি বিশেষ সামরিক বিমান প্রশিক্ষিত কুকুর ও ড্রোনসহ ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তার পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ ও পরিবহন বিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, "আমি চাই ভেনেজুয়েলার মানুষ জানুক যে, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য আসছে।"
রাজনৈতিকভাবে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া ভেনেজুয়েলায় এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। ছয় মাস আগে তৎকালীন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন শাসনভার গ্রহণ করেছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। যা রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও উসকে দিয়েছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মহাসচিব ইয়ান এগেল্যান্ড বলেন, "দশকের পর দশক বিনিয়োগের অভাবে ভেঙে পড়া অবকাঠামোর কারণে এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।" আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক তৎপরতা সত্ত্বেও নিখোঁজদের সংখ্যা ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের কারণে নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা আরও অনেক বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
