বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের যশোর জেলার বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের অবৈধ পুশব্যাক ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পাহারায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা। ছবি: এপি
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে সংখ্যালঘু বাঙালি বাসিন্দাদের—যাদের বেশিরভাগই মুসলিম—জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অনুপ্রবেশ ঠেকাতে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় বহু পরিবার দুই দেশের মধ্যবর্তী ‘জিরো লাইনে’ চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে আটকা পড়ছে। বাংলাদেশি সীমান্ত কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের অন্তত ২১টি পুশ-ইন প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি, যার ফলে শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষ সীমান্তে আটকা পড়ার পর তীব্র উত্তেজনার মুখে ভারতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জোরপূর্বক এই ‘পুশব্যাক’-এর চেষ্টা চালাচ্ছে।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত, বাতিল ও বহিষ্কার) নীতির আওতায় শত শত বাঙালিকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৫ জুন বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে শিশুসহ ১০ জনকে পুশব্যাকের চেষ্টার পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে টানা ৭৫ ঘণ্টার এক চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়।
রুবেল হোসেন (৩৫) নামে স্থানীয় এক সীমান্তবাসী জানান, "দলটি বাংলাদেশি ভূখণ্ডের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট চলে এসেছিল। গ্রামবাসীরা বিজিবিকে সতর্ক করলে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং দলটি পিছু হটে নো ম্যানস ল্যান্ডের বাঁধে অবস্থান নেয়। প্রথম রাতে তারা প্রচণ্ড বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মুখে পড়ে। বিএসএফ ও বিজিবির ব্যাপক মোতায়েনে এটি যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। পরে কয়েক দফা পতাকা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর বিএসএফ তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেয়।"
একইভাবে গত ৬ জুন টেটুলবাড়িয়া সীমান্তে দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের শিশুসহ ৬ সদস্য এবং ৮ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের জিরো লাইনে এক গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জন প্রায় ৪৮ ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে আটকে থাকার পর বিজিবি’র তীব্র বাধায় বিএসএফ তাদের ফেরত নিতে বাধ্য হয়।
মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চের নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়, যা এই গণ-আটক ও পুশব্যাকের মূল কারণ। এর আগে ২০১৯ সালে আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার (এনআরসি) কারণে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বারবার ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে সম্প্রতি বলেছেন, "আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং আক্ষরিক অর্থেই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই।"
পঞ্চগড় সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাসিবুর ইসলাম জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে আসা এমন একটি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন যাদের বৈধ ‘আধার কার্ড’ ছিল। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি এই পুশব্যাককে অবৈধ আখ্যা দিয়ে বলেন, "ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে। যা তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে চরমভাবে উপেক্ষা করে। জাতীয়তা যাই হোক না কেন, কোনো মানুষকে দুই সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতকে এই নির্মম প্রত্যাবাসন বন্ধ করতে হবে।"
সংস্থাটি আরও জানায়, পশ্চিমবঙ্গে শত শত কথিত অবৈধ বাংলাদেশিকে আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে, যাদের মধ্যে মুসলিম ছাড়াও কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বী রয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের কাগজপত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে সীমান্ত পেরিয়ে কাউকে পুশব্যাক করা হলে বাংলাদেশ তা কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না। যেকোনো ধরনের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া এবং যথাযথ নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
