ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলো। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান তাদের সিংহভাগ অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা ও বার্ধক্যজনিত কল্যাণে ব্যয় করছে, সেখানে চীন ও ভারত তাদের মূল মনোযোগ ধরে রেখেছে মেগা অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়নে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮৫০ লাখ কোটি টাকারও বেশি) ব্যয় নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম বাজেটের রেকর্ড ধরে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাতীয় বাজেট কেবল বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি একটি দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত দর্শনের দর্পণ। বৈশ্বিক এই বাজেট যুদ্ধ ও ব্যয়ের ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিরক্ষা ব্যয়ে একক আধিপত্য বজায় রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড কর্মসূচিতে। তবে সামরিক খাতে দেশটির ৯২১ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় বিশ্বের মোট সামরিক বাজেটের প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা তার বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশলকে স্পষ্ট করে।
অন্যদিকে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজেটধারী দেশ চীন ২০২৫ সালে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের (২৮.৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান) সরকারি ব্যয় করেছে। চীনের বাজেট দর্শনের মূল ভিত্তি হলো উচ্চগতির রেলপথ, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, সমুদ্রবন্দর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো উৎপাদনশীল খাতে বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। পাশাপাশি, ২৫১ বিলিয়ন ডলার সামরিক ব্যয় নিয়ে প্রতিরক্ষা খাতেও বেইজিং এখন ওয়াশিংটনের ঠিক পেছনে অবস্থান করছে।
ইউরোপের অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদার রাষ্ট্র ফ্রান্স, যাদের সরকারি ব্যয় তাদের জিডিপির প্রায় ৫৫ শতাংশ। পেনশন, বেকার ভাতা ও স্বাস্থ্যসেবার পেছনে বিপুল খরচের কারণে ফ্রান্স, ইতালি ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোর বাজেট জিডিপির অর্ধেক ছুঁয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের জেরে ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি তাদের ঐতিহ্যগত রক্ষণশীল নীতি ভেঙে ২০২৬ সালের ৫২০ বিলিয়ন ইউরোর বাজেটে প্রতিরক্ষা ও গ্রিন এনার্জিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এদিকে এশিয়ার উদীয়মান পরাশক্তি ভারত তার বিশাল বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উৎপাদনশীল শিল্প খাতকে। একই সাথে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনাবাহিনী পরিচালনার কারণে দেশটি শীর্ষ সামরিক ব্যয়কারী দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বিপরীতে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরব তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ ও ‘নিওম’ প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে শত শত বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঢালছে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একজন জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বলেন, "বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ দেশই, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান, বিপুল ঘাটতি ও ঋণের বোঝা নিয়ে বাজেট পরিচালনা করছে। এর বিপরীতে নরওয়ে ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সার্বভৌম তহবিল ব্যবহারের মাধ্যমে নিয়মিত উদ্বৃত্ত বাজেট ধরে রেখে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।"
পরিশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক বাজেটের এই চিত্র প্রমাণ করে যে পরাশক্তিগুলো এখন কেবল সামরিক শক্তিতে নয়, বরং অর্থনৈতিক টেকসইকরণ ও নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে একে অপরকে টেক্কা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যেখানে বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, জাপান সেখানে বার্ধক্যের ব্যয় সামলাচ্ছে এবং ভারত লড়ছে পরিকাঠামো উন্নয়নের দৌড়ে, যা বিশ্ব অর্থনীতির এক নতুন মেরুকরণকে নির্দেশ করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
