রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পাঠানো সরাসরি শান্তি বৈঠকের একটি খোলা চিঠিকে ‘অমার্জিত’ আখ্যা দিয়ে তা নাকচ করে দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিনের দাবি, কিয়েভ প্রকৃত শান্তি নয়, বরং রণক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামাতে এবং নিজেদের সামরিক পুনর্গঠনের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতির কৌশল খুঁজছে। পুতিনের এমন প্রতিক্রিয়ার পর জেলেনস্কি বলেছেন, মস্কো দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পরিবর্তে পুনরায় যুদ্ধকেই বেছে নিচ্ছে।
শুক্রবার (৫ জুন) সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া এক বক্তব্যে পুতিন জানান, এই মুহূর্তে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মুখোমুখি বসার কোনো প্রয়োজন তিনি দেখছেন না।
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ক্রেমলিনে একটি খোলা চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ওয়াশিংটনের মনোযোগের কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে না থেকে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি আলোচনায় বসার তাগিদ দিয়েছিলেন। তবে সেন্ট পিটার্সবার্গে অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে পুতিনকে যখন প্রশ্ন করা হয় তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না, তখন তিনি বলেন, "এটি কি মুখোমুখি বৈঠকের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার একটি উপায় ছিল, নাকি এমন একটি উপায় ছিল যাতে মুখোমুখি বৈঠক না হয়? আমার মনে হয়, দ্বিতীয়টিই সঠিক।"
পুতিন বলেন, "আমাদের দরকার একটি চুক্তি, যা ছয় কিংবা তিন মাসের জন্য নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে। বিশেষজ্ঞদের প্রথমে কাজ করতে দিন এবং কিছু সমাধান বের করতে দিন, তারপর আমরা দেখা করতে পারি।"
রুশ প্রেসিডেন্টের এই প্রত্যাখ্যানের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে লিখেছেন, "তিনি (পুতিন) যুদ্ধ শেষ করতে চান না। আমার মনে হয় বিশ্বের অনেক মানুষই এই উত্তরে হতাশ হয়েছে।"
মস্কো জানিয়েছে, ইউক্রেনকে যদি যুদ্ধ থামাতে হয় তবে অবশ্যই দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও ঝাপোরিজ্জিয়া অঞ্চল থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং একই সাথে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগদানের বৈশ্বিক প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে।
তবে কিয়েভ প্রশাসন এই শর্তকে শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউক্রেনীয় কৌশলবিদদের মতে, ২০১৪ সালে ক্রাইমিয়া উপত্যকা অবৈধভাবে দখলের আট বছর পরই রাশিয়া এই পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। ফলে এবারও যদি মস্কোকে কোনো ধরনের ভূখণ্ডগত ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা ভবিষ্যতে তাদের আরও বড় ধরনের আগ্রাসনে উৎসাহিত করবে।
উল্লেখ্য, জেলেনস্কির পাঠানো ওই চিঠিতে কেবল আলোচনার প্রস্তাবই ছিল না, বরং তাতে কিছুটা বিদ্রূপাত্মক সুরও ছিল। ২৬ বছর ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকা পুতিনের ওপর ‘বয়সের প্রভাব’ পড়তে শুরু করেছে বলে জেলেনস্কি সেখানে মন্তব্য করেন। পাশাপাশি সম্প্রতি রাশিয়ার অভ্যন্তরে ও সেন্ট পিটার্সবার্গে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলাকে তিনি উপহাস করে ‘একটি সফর’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। পুতিন এই মন্তব্যগুলোকে অত্যন্ত ‘অমার্জিত’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
যদিও এই চিঠি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে হোয়াইট হাউজে কিছুটা আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, "যদি দুই নেতা সত্যিই সাক্ষাৎ করেন, তাহলে সেটা দারুণ হবে।" তবে পুতিনের সর্বশেষ বক্তব্যের পর সেই কূটনৈতিক সম্ভাবনা আপাতত ভেস্তে গেল।
কূটনৈতিক এই অচলাবস্থার মধ্যেই রণক্ষেত্রে উভয় পক্ষের হামলা-পাল্টা হামলা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী শুক্রবার দাবি করেছে, তারা আজভ সাগর এবং রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা উপকূলীয় জলসীমায় শস্য চুরি ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে নিয়োজিত পাঁচটি রুশ জাহাজে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজভ সাগরে দুটি জাহাজে হামলায় ৫ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করলেও হামলার দায় কার, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
এদিকে, ইউক্রেনের একটি ড্রোন পথ হারিয়ে কৃষ্ণ সাগর তীরবর্তী ন্যাটোভুক্ত দেশ রোমানিয়ার একটি বন্দরে বিস্ফোরিত হয়েছে। ইউক্রেনীয় অপারেটরদের দাবি, রাশিয়ার শক্তিশালী ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সিগন্যাল হস্তক্ষেপের কারণেই ড্রোনটি নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল।
সংঘাতের তীব্রতা ফ্রন্টলাইন ছাড়িয়ে ইউক্রেনের বেসামরিক অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৭০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি দুগ্ধ কারখানায় রুশ হামলায় ৪ জন শ্রমিক নিহত হন এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন প্রদেশে একটি পেট্রোল স্টেশনে ড্রোন হামলায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারী প্রাণ হারান। পুতিন জানিয়েছে, রাশিয়ার নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য সম্পূর্ণ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান কোনোভাবেই থামবে না।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
