ফাইল ছবি
ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা যোগী আদিত্যনাথের নতুন উস্কানিমূলক মন্তব্য এবং মুম্বাইয়ে ঈদুল আজহা কেন্দ্রিক পরিকল্পিত হয়রানির ঘটনায় দেশটির সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকজন মুসলিম ধর্মগুরুর গরুকে ‘জাতীয় পশু’ ঘোষণার দাবির জবাবে যোগী আদিত্যনাথ ওয়াকফ সম্পত্তির জমিতে হিন্দু পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের উস্কানিমূলক ইঙ্গিত দেন এবং পাকিস্তানে বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের নিয়ে মুসলিমদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি মাঠপর্যায়ে সংখ্যালঘুদের ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মেরুকরণ বাড়াতে সরাসরি ইন্ধন জোগাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যোগী আদিত্যনাথের এই আগ্রাসী অবস্থান ভারতের ক্ষমতাসীনদের ধারাবাহিক মুসলিম বিরোধী রাজনীতিরই অংশ। সম্প্রতি হিন্দু সংস্কৃতিতে গরুর উচ্চস্থান উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, গঙ্গার মতো আনুষ্ঠানিকভাবে গরুকে আলাদা করে ‘মাতা’ ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই। একই সাথে মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে মুম্বাইয়ের একটি আবাসিক এলাকায় ছাগল রাখায় সাধারণ মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিত হয়রানি চালানো হয়েছে।
মুম্বাইয়ের ওই ঘটনায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস ও বজরং দলের সদস্যরা মুসলমানদের ভয় দেখাতে এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করতে সেখানে একটি শুকর নিয়ে আসে এবং হিন্দু মন্ত্র পাঠ করতে থাকে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের হস্তক্ষেপে মুসলিমরা তাদের কোরবানির পশু অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই ঘটনার পেছনে ধর্মীয় কোনো পবিত্র আচারের সম্পর্ক নেই, এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ইতিহাসবিদরা এই ঘটনাকে অতীতে ১৯৮০ সালে মুরাদাবাদে ঈদের জামাতে শুকর ছেড়ে দেওয়ার ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে তুলনা করছেন, যার জেরে সৃষ্ট ভয়াবহ দাঙ্গায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে ‘গৌরক্ষক বাহিনী’র নামে উগ্রবাদীদের দৌরাত্ম্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। প্রায়শই গরু পাচার বা জবাইয়ের মিথ্যা অভিযোগে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যার (মব লিঞ্চিং) ঘটনা ঘটছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনের একজন শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "বিজেপি গরুর ইস্যুটিকে স্রেফ তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল এবং ভোটব্যাংক রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। রাষ্ট্র যখন উস্কানিমূলক বক্তব্যকে প্রশ্রয় দেয়, তখন মাঠপর্যায়ে বজরং দলের মতো সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হওয়ার লাইসেন্স পেয়ে যায়।"
অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশ সরকারের এক মুখপাত্র মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে ডিফেন্ড করে দাবি করেছেন, "মুখ্যমন্ত্রী কেবল সনাতন সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র এবং প্রতিবেশী দেশে হিন্দুদের মানবাধিকারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ খোঁজা অবান্তর।"
বর্তমানে ভারতের এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও উস্কানিমূলক পরিবেশ দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন দিনগুলোতে যদি এই ধরনের রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং মব লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
