তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী।
বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাঙনের মুখে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে দুই প্রভাবশালী বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কারের পর দলটির ভেতরে এক নজিরবিহীন ‘বিদ্রোহ’ রূপ নিয়েছে। গত রোববার দলীয় প্রধান মমতা ব্যানার্জী নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককে জরুরি বৈঠকে ডাকলেও সেখানে হাজির হন মাত্র ২০ জন। এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভের আগুন আরও উসকে দিয়ে বিরোধী দল বিজেপির নেতা তাপস রায় দাবি করেছেন, দলটির প্রায় ৫০ জন বিধায়ক ইতিমধ্যে স্পিকারের দ্বারস্থ হয়েছেন এবং তৃণমূলের অবস্থা এখন ‘মহারাষ্ট্রের মতো’ হতে চলেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত গত ১৯ মে কালীঘাটে দলের এক বৈঠককে কেন্দ্র করে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপ-দলনেতা ও মুখ্য সচেতকের নাম চূড়ান্ত করার প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের যে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল, তাতে ব্যাপক অসংগতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ, ১৯ মের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বেশ কয়েকজন বিধায়কের ভুয়া সই করানো হয় এবং সইয়ের তারিখ ব্যাক-ডেট বা পেছনের তারিখ (৬ মে) দেখাতে বাধ্য করা হয়। এই ‘স্বাক্ষর জালিয়াতির’ বিষয়টি স্পিকারের নজরে আনেন দলেরই দুই বিধায়ক ঋতব্রত ও সন্দীপন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় মামলা দায়ের হয় এবং রাজ্য পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঘটনার জেরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে তলব করেছে সিআইডি, যদিও ‘শারীরিক অসুস্থতার’ কারণ দেখিয়ে গত সোমবার তিনি হাজিরা এড়ান।
এএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বহিষ্কৃত বিধায়ক সন্দীপন সাহা বলেন, “দলে নৈতিক কথাবার্তা বললেই দলবিরোধী কার্যকলাপের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়, কারণ দল নিজেই নৈতিক আচরণ করে না।” অন্যদিকে, ঋতব্রত ব্যানার্জী বলেন, “দলের বৈঠকে সই করার সময় আমাদের বলা হয়েছিল আপনারা ১৯ মে তারিখে মিটিং করলেও সইয়ের নিচে ৬ মে লিখুন। আমরা তখন ভয়ে কিছু বলতে পারিনি। সেখানে এমন অনেকের সই রয়েছে যারা বৈঠকেই আসেননি।” তবে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও মমতা ব্যানার্জীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে বলে জানান তিনি।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত উঠে যাওয়া একটা পার্টি।” জবাবে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই বিদ্রোহের পেছনে বিজেপির উসকানি রয়েছে বলে দাবি করেছে। কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক ফেসবুক লাইভে মমতা ব্যানার্জী ঋতব্রত ব্যানার্জীর নাম না করে বলেন, “ও আগে সিপিএম করত, আমাদের ভুল হয়েছে ওকে টিকিট দেওয়া। পায়ে এসে পড়েছিল।” দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জিতে গেলে, সরকার গড়লে সব ভালো, আর আজ দল ক্ষমতায় নেই বলে সব খারাপ হয়ে গেল?”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা ব্যানার্জী তাঁর নিজের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর আসনেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর দলে তাঁর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছে। তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ বা অন্তত ৫৩ জন বিধায়ক যদি দলত্যাগ করতে রাজি হন, তবে তাঁরা দল ভেঙে বিধানসভায় বিকল্প বিরোধী দলনেতার পদের দাবি জানাতে পারেন। তবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অন্য দল থেকে ভাঙিয়ে কাউকে দলে না নেওয়ার ব্যাপারে যে অনমনীয় অবস্থান দেখিয়েছে, তা এই বিদ্রোহীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও, দলটির অভ্যন্তরে যেভাবে অভিষেক ব্যানার্জীর নেতৃত্ব ও স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গে মমতার রাজনৈতিক অস্তিত্বকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
