ক্রেমলিনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বেলারুশের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত ‘ট্যাকটিক্যাল’ ও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মহড়া তদারক করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনার মাঝেই পূর্ব ইউরোপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক নজিরবিহীন যৌথ পারমাণবিক মহড়া শেষ করেছে রাশিয়া ও বেলারুশ। গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার (১৯-২১ মে) পর্যন্ত চলা এই মহড়ায় প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, যেখানে ‘ট্যাকটিক্যাল’ ও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ উভয় ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের রণকৌশল ঝালিয়ে নেওয়া হয়। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরের ঘাঁটিতে রাশিয়ার এই পারমাণবিক বোমার মজুদ ও হঠাৎ যুদ্ধপ্রস্তুতি বৃদ্ধির ঘটনা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, যা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে ‘বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপের’ আগাম আভাস।
ক্রেমলিন থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং বেলারুশ থেকে আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো সরাসরি এই মহড়া তদারক করেন। এতে কয়েক শ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক সাবমেরিন অংশ নেয়। মহড়ার অংশ হিসেবে পুতিন ও লুকাশেঙ্কো যৌথভাবে 'ইয়ার্স' নামক একটি আন্তমহাদেশীয় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের নির্দেশ দেন। ক্ষেপণাস্ত্রটি মাত্র ২০ মিনিটের কম সময়ে ৫ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় কামচাতাকা উপদ্বীপে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানে।
গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, "স্ট্র্যাটেজিক ও ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর প্রস্তুতির মাত্রা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। মস্কো ও মিনস্ক ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে এই ক্ষেত্রে পুরোদমে কাজে লাগাবে।"
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ বেলারুশে ১৯৯৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ৭১ বছর বয়সী আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোকে প্রায়ই ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরশাসক’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। মস্কোর বিপুল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থনের ওপর টিকে থাকলেও লুকাশেঙ্কো পুতিনের বেলারুশকে রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত করার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সফলভাবে ঠেকিয়ে আসছেন। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পরপরই এক সংবিধান সংশোধনী গণভোটের মাধ্যমে বেলারুশে রুশ পারমাণবিক অস্ত্র রাখার আইনি অনুমোদন দেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো বলেন, "আমরা কাউকে হুমকি দিচ্ছি না। তবে আমাদের কাছে তেমন (পারমাণবিক) অস্ত্র আছে। বেলারুশের ব্রেস্ট শহর থেকে রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দর ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত আমাদের পিতৃভূমি রক্ষায় আমরা যেকোনো উপায় অবলম্বনে প্রস্তুত।"
বর্তমানে মস্কো মিনস্ককে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বিশেষ সংস্করণের সু-২৫ যুদ্ধবিমান, ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অগণিত ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক বোমা সরবরাহ করেছে, যা আসিপোভিচি ঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে।
হঠাৎ করে কোনো দৃশ্যমান বাহ্যিক কারণ ছাড়াই এই বিশাল পারমাণবিক মহড়া বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন আল-জাজিরাকে বলেন, "ঘটনাগুলো হঠাৎ করেই ঘটছে। দৃশ্যত বাহ্যিক কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না। তবে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহসহ এ ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে।"
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনে উল্লেখযোগ্য এলাকা দখলে ব্যর্থ হয়ে রাশিয়া এখন উত্তর ইউক্রেন ও রাজধানী কিয়েভে নতুন করে হামলা চালাতে বেলারুশকে ‘নতুন আগ্রাসনের পথে’ টেনে আনছে।
২০২২ সালের যুদ্ধের শুরুতে বেলারুশ সীমান্ত ব্যবহার করে কিয়েভ দখলের রুশ পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও, ওই ১ হাজার ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঘন বন ও জলাভূমির সীমান্ত এখনো ইউক্রেনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রের অবরুদ্ধ এলাকা দিয়ে গতবার আক্রমণ চালাতে গিয়ে বেশ কিছু রুশ সেনা তেজস্ক্রিয়তার শিকারও হয়েছিলেন।
তবে কিয়েভভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান 'পেন্টা'-র প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো মনে করেন, এখনই নতুন কোনো বড় স্থল আক্রমণের জন্য বেলারুশে রুশ সেনার উপস্থিতি পর্যাপ্ত নয়। তাঁর মতে, সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো লুকাশেঙ্কোর জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তা সত্ত্বেও, ইউক্রেন সীমান্তের এত কাছে রাশিয়ার পারমাণবিক বোমার নতুন চালান মোতায়েন এবং পুতিনের এই পারমাণবিক হুঁশিয়ারি সামগ্রিক যুদ্ধকে এক চূড়ান্ত ও বিপজ্জনক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
