হাভানার তীরে এক কিউবাবাসীর মাছ ধরছেন, অদূরে নোঙর করে আছে মেক্সিকোর ত্রাণবাহী জাহাজ। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে চলমান বৈরী সম্পর্কের মাঝে কিউবার ওপর নতুন করে হামলার গুঞ্জন বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। মার্কিন ভূখণ্ডের অতি নিকটে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তৈরির জন্য ওয়াশিংটন বিভিন্ন 'অজুহাত' খুঁজছে বলে অভিযোগ করেছে হাভানা। এদিকে, জ্বালানি ও খাদ্য সংকটে বিপর্যস্ত কিউবা বর্তমানে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যাকে দেশটির প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল ‘গণহত্যার সামিল’ বলে অভিহিত করেছেন।
সম্প্রতি কিউবার কমিউনিস্ট শাসকদের লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। গত ১৯ মে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, ফ্লোরিডায় ড্রোন হামলার যে আশঙ্কার কথা যুক্তরাষ্ট্র প্রচার করছে, তা মূলত কিউবায় সরাসরি সামরিক হামলার একটি সাজানো অজুহাত মাত্র।
কিউবার সরকারি ভাষ্যমতে, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো সামরিক হুমকি নয় এবং যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছাও তাদের নেই। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রদ্রিগেজ বলেছেন, "যুদ্ধে না জড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও বাইরের শত্রু দেশের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার ইচ্ছা কিউবাবাসী ছাড়েনি।"
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধের ফলে কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজধানী হাভানাসহ পুরো দ্বীপরাষ্ট্র যেন শিল্পযুগের আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। কলকারখানা অচল, দোকানপাট পণ্যশূন্য এবং দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বাসিন্দারা এখন খাবারের সন্ধানে হাহাকার করছেন এবং অনেকে বাধ্য হয়ে খোলা জায়গায় ঘুমাচ্ছেন।
সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ব্যবধান আকাশচুম্বী। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ৩২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিপরীতে কিউবার অর্থনীতি মাত্র ১০৭ বিলিয়ন ডলারের। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার সূচক অনুযায়ী, সামরিক শক্তির দিক থেকে ১৪৫টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শীর্ষে, আর কিউবার অবস্থান ৬৮তম। আয়তনে কিউবার চেয়ে প্রায় ৯০ গুণ বড় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকেই কিউবার ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের পর থেকেই ওয়াশিংটন-হাভানা সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়, যা ১৯৬১ সালের 'বে অব পিগস' অভিযান এবং ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক 'ক্ষেপণাস্ত্র সংকট'-এর মতো ঘটনার জন্ম দেয়। কয়েক দশক ধরে নানা নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে কিউবার অর্থনীতিকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। গত ২০ মে মার্কিন বিচার বিভাগ কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনায় কূটনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ এবং ইরানে সাম্প্রতিক হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য এখন কিউবা। কিউবায় কোনো সামরিক অভিযান পরিচালিত হবে কি না, নাকি অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনে বাধ্য করা হবে—সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে। তবে এ কথা স্পষ্ট যে, ভূ-রাজনৈতিক এই সমীকরণে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ কিউবাবাসী, যাদের প্রতিদিনের জীবন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
