ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ সাড়ে ছয় দশক ধরে টিকে থাকা ‘ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি’ বা সিন্ধু পানি চুক্তির ভাগ্য এখন নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মুখে। ছবি: সংগৃহীত
১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক ‘ইন্দাস ওয়াটার্স ট্রিটি’ (আইডব্লিউটি) বা সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি ইস্যুতে চিরবৈরী প্রতিবেশী ভারতের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক জয় পেয়েছে পাকিস্তান। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত ‘পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ (পিসিএ) গত শুক্রবার এক রায়ে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করে জানিয়েছে, ভারত একতরফাভাবে এই চুক্তি স্থগিত করতে পারে না। একই সঙ্গে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ভারতের ‘পন্ডেজ’ (বাঁধের পেছনে সাময়িকভাবে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা) ব্যবহারের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের আপত্তিকে বৈধতা দিয়েছে আদালত। তবে নয়াদিল্লি অবিলম্বে এই রায়কে ‘অবৈধ’ ও ‘অকার্যকর’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
"পিসিএর এই রায় পাকিস্তানের মূল অবস্থানকেই নিশ্চিত করেছে যে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোতে ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর সিন্ধু পানি চুক্তি বাস্তব ও আইনগত সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।"
— পাকিস্তান সরকার (এক্স-এর অফিসিয়াল পোস্টে)।
বিতর্কের মূলে রয়েছে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নির্মাণাধীন ‘রাতলে’ ও ‘কিশেঙ্গাঙ্গা’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, এই প্রকল্পগুলোর নকশা এমনভাবে করা হয়েছে—যাতে ভারত ‘পন্ডেজ’ ও গেটযুক্ত স্পিলওয়ের মাধ্যমে সাময়িকভাবে নদীর পানিপ্রবাহ আটকে রাখতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গত বছরের এপ্রিলে কাশ্মীরের পাহেলগামে এক প্রাণঘাতী হামলার পর ভারত একতরফাভাবে ১৯৬০ সালের এই পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল। পিসিএ তাদের সর্বশেষ রায়ে জুনের আগের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে স্পষ্ট জানিয়েছে, চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়কে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত শনিবার এক কড়া বিবৃতিতে নয়াদিল্লি আন্তর্জাতিক এই সালিশি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
"ভারত বর্তমান তথাকথিত রায়কে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে, যেমনটি অবৈধভাবে গঠিত তথাকথিত কোর্ট অব আরবিট্রেশনের আগের সব ঘোষণাও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ধরনের কোনো কার্যক্রম, রায় বা সিদ্ধান্ত বাতিল ও অকার্যকর।"
— পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভারত।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনি লড়াই এমন এক সময়ে চূড়ান্ত রূপ নিল যখন গত বছরের মে মাসে তিন দিনের সামরিক সংঘাতের পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে। তবে সম্প্রতি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির আদর্শিক মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে এবং এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তানের সঙ্গে পুনরায় সংলাপের পক্ষে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। যদিও সুইডেনের আপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অশোক সোয়াইন মনে করেন, আরএসএস ইঙ্গিত দিলেও মোদি সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যায়নি।
বোস্টনভিত্তিক স্বাধীন পানি আইন ও নীতিবিষয়ক গবেষক ইরুম সাত্তার এই রায়কে টেকনিক্যালি সঠিক বললেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “যখন কোনো পক্ষ আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন বাস্তবে এর প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে।” বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কাজে লাগিয়ে ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, রায় বাস্তবায়নে তারা বৈশ্বিক কূটনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করা অব্যাহত রাখবেন।
তথ্যসূত্র: নিক্কেই এশিয়া
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
