ডোনাল্ড ট্রাম্প । ফাইল ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার একের পর এক আলটিমেটাম দিয়েও শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার পিছু হটার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিক যুদ্ধের হুমকি দেওয়ার পর, সর্বশেষ কয়েকটি আরব দেশের নেতার ‘অনুরোধের অজুহাতে’ তেহরানের ওপর হামলা চালানো থেকে আবারও বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও শীর্ষ গণমাধ্যমগুলোর দাবি, কোনো অনুরোধ নয়, বরং ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতার চরম বহিঃপ্রকাশ, শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তেহরানের অনমনীয় অবস্থানের কারণেই হোয়াইট হাউজ এখন বড় ধরনের কৌশলগত চোরাবালিতে আটকা পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা মার্কিন প্রশাসনকে এক ধরনের নীতিগত বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে ফেলে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রায় প্রতিদিনই ইরানের বিরুদ্ধে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘পুনরাবৃত্তির সিনড্রোম’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি কখনো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ হুমকি দিচ্ছেন, আবার পরদিনই আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানাচ্ছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তনকে মার্কিন বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিন ‘মিথ্যার এক দুষ্টচক্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেছেন, “ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে হুমকি দিয়ে আসছেন যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খোলা না রাখে এবং আলোচনায় যৌক্তিক আচরণ না করে, তাহলে ভয়ংকর ঘটনা ঘটবে। কিন্তু এখন কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে এবং এসব হুমকির একটিও বাস্তবায়িত হয়নি।”
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে ওয়াশিংটন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক পাহারা পরিকল্পনা পরীক্ষা করেছিল। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) তীব্র ও সামরিক প্রতিরোধের মুখে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আমেরিকার সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এর আগে পাকিস্তানের অনুরোধের দোহাই দিয়ে এই প্রজেক্ট একবার স্থগিত করেছিলেন ট্রাম্প।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড এবং সরাসরি সংঘাত—ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সবকটি ‘কার্ড’ এখন পুড়ে গেছে। প্রবীণ মার্কিন সাংবাদিক জেরালদো রিভেরা মনে করেন, ইরানিরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ধরে ফেলেছে এবং তারা নিশ্চিত যে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সবসময় পিছু হটেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরান তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পুনর্গঠন করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পেন্টাগন হোয়াইট হাউজকে সতর্ক করেছে যে মার্কিন বিমান অভিযান নিখুঁতভাবে শনাক্ত ও প্রতিহত করার পূর্ণ সক্ষমতা এখন তেহরানের রয়েছে। এই সামরিক সতর্কতাই ট্রাম্পকে নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে মার্কিন প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে লিখেছে, “বর্তমান সামরিক বিকল্পগুলোর কোনোটিই—তা বড় আকারের হামলা হোক কিংবা নেতৃত্বকে লক্ষ্য করা—বিশ্বস্ত ও কম ব্যয়বহুল সমাধান দেয় না। ট্রাম্পের জন্য এখন ইরানের সঙ্গে চুক্তির পথ খোঁজাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।”
আইআরজিসি’র সাবেক প্রধান কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি এক্স-এ লিখেছেন, “ট্রাম্প নিজেই হামলার সময়সীমা নির্ধারণ করেন এবং নিজেই তা বাতিল করেন। তিনি আশা করেন এতে ইরানের জনগণ ও কর্মকর্তারা আত্মসমর্পণ করবে, কিন্তু ইরানের লৌহমুষ্টিই তাকে পিছু হটতে বাধ্য করছে।”
৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ট্রাম্প এখন এক চরম রাজনৈতিক উভয়সংকটের মুখোমুখি। একদিকে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর মতো নির্ভরযোগ্য পথ নেই, অন্যদিকে ইরানের শর্ত মেনে চুক্তিতে এলে তা দেশের অভ্যন্তরে তাঁর কট্টর সমর্থকদের কাছে তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করবে। তবে তেহরান তাদের অবস্থানে অনড়; মাঠের সামরিক লড়াইয়ে যে সার্বভৌমত্ব ও অধিকার ইরান হারায়নি, ট্রাম্পের ফাঁকা হুমকির মুখে আলোচনার টেবিলে তা কোনোভাবেই ছেড়ে দেবে না—এই বার্তা তারা ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
