মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি বাড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের তৎপরতা। ছবি: এএফপি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার দায়ে ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার, নির্বাসন এবং নাগরিকত্ব বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাহরাইন ও কুয়েতসহ ওই অঞ্চলের দেশগুলো জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর কড়া নজরদারি ও দমন-পীড়ন শুরু করেছে। ইতিমধ্যে শুধু বাহরাইনেই এক ডিক্রিতে ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে এবং কুয়েতে ২৩ এপ্রিল একযোগে ১৩৫ জনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে নিরাপত্তা আদালত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে বাকস্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনীতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতির উত্তাপ এখন সাধারণ নাগরিকদের অনলাইন দেয়ালে এসে লেগেছে। সংঘাতের শুরু থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে ইরানি হামলার ভিডিও ধারণ বা তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নজরদারি এখন ভিন্নমত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো রাস্তাঘাটে চেকপোস্ট বসিয়ে সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন তল্লাশি করছে এবং বার্তা, ছবি ও ভয়েস নোট পরীক্ষা করছে।
কুয়েতের নিরাপত্তা আদালত গত ২৩ এপ্রিল সোশাল মিডিয়া-সম্পর্কিত মামলায় ১৭ জন আসামিকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং এক ফেরারি আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তবে এই মামলা থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত কুয়েতি লেখক আহমেদ শিহাব-এলদিন ৫২ দিন আটক থাকার পর খালাস পেয়েছেন। কুয়েতের নতুন ডিক্রি অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন করে এমন পোস্ট দিলে ৩ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৩২,৫০০ ডলার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে কোনো পোস্টে ‘লাইক’ দেওয়া বা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, যাদের বেশিরভাগই শিয়া সম্প্রদায়ের।
কুয়েতের কেন্দ্রীয় কারাগারে গর্ভবতী নারীসহ বহু নাগরিককে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং বিমান চলাচল শুরু হতেই বিদেশি নাগরিকদের ডিপোর্টেশন সেন্টার থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। কুয়েতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের ১৩ ও ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষতি করলে বা যুদ্ধরত কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করলে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২৭ এপ্রিল বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল খলিফার নির্দেশনায় একযোগে ৬৯ জনের বাহরাইনি নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। তাদের বিরুদ্ধে "শত্রুভাবাপন্ন ইরানি কর্মকাণ্ডের প্রশংসা ও সমর্থন করার" অভিযোগ আনা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাহরাইনে নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও বিদেশিসহ অন্তত ৩০৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
এই কঠোর দমন-পীড়নের তীব্র সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের গবেষক মাহমুদ শালাবি বলেন, "আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। বাহরাইনে অনেককে আইনজীবীর সহায়তা নিতে দেওয়া হচ্ছে না এবং কুয়েতের নতুন আইনের ফলে বিচারিক আপিলের সুযোগ কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। এই পদক্ষেপগুলো একটি তীব্র স্ব-নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করেছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে অসম্ভব করে তুলছে।"
একইভাবে বাহরাইন ইনস্টিটিউট ফর রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রাসির অ্যাডভোকেসি পরিচালক সাইয়েদ আহমেদ আলওয়াদায় এই পদক্ষেপকে "দমন-পীড়নের একটি বিপজ্জনক যুগের সূচনা" বলে অভিহিত করেছেন, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকবে।
তবে বাহরাইন সরকারের এক মুখপাত্র বিবিসি-কে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারগুলো রাজনৈতিক নয়, বরং সম্পূর্ণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে করা হয়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো "সন্ত্রাসী সংগঠন"-এর সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে "ইরানি আগ্রাসনকে" সমর্থন করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল করার অভিযোগে একই ধরণের আইনি তৎপরতা জোরদার করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই আইনি কড়াকড়ি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদে মুক্ত গণমাধ্যম ও নাগরিক অধিকারকে সম্পূর্ণ খর্ব করবে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ ও স্বেচ্ছাচারী নাগরিকত্ব বাতিলের প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
