ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন (বামে) এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (ডানে)।
ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অবক্ষয় এবং ধর্মীয় ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত হওয়া নিয়ে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন-এর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডাচ প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্বেগ প্রকাশের জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে 'তথ্যের অভাব ও অসচেতনতা' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ডস সফরের ঠিক আগমুহূর্তে ডাচ সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আসে, যা পরবর্তীতে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ব্রিফিংয়ে মূল আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পাঁচ দেশীয় সফরের অংশ হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস সফর শেষ করেছেন। তবে এই সফরকে ছাপিয়ে আলোচনায় এসেছে ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন-এর একটি মন্তব্য। ডাচ সংবাদপত্র 'ডি ফোকসক্র্যান্ট'-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার মোদীর আমস্টারডাম পৌঁছানোর আগে জেটেন বলেন, "ডাচ সরকার ভারতের ঘটনাবলী নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং এই উদ্বেগ সমগ্র ইউরোপ জুড়ে অনুভূত হচ্ছে।"
ডাচ প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর দুই দেশের সরকার প্রধানদের কোনো যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। পরবর্তীতে রবিবার ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে একজন ডাচ সাংবাদিক এই বিষয়ে প্রশ্ন তুললে ভারতের পক্ষ থেকে কড়া জবাব দেওয়া হয়।
সংবাদপত্রটির তথ্যমতে, প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "এটি কেবল সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয় নয়, বরং সংখ্যালঘুদের অধিকারেরও বিষয়, যারা সেখানে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়, তবে এটি আরও অনেক ছোট সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উদ্বেগটি হলো, ভারত এখনও সকলের সমান অধিকার সুরক্ষিত করা একটি সমন্বয়মূলক (ইনক্লুসিভ) সমাজ হিসেবে টিকে আছে কি না।"
ডাচ প্রধানমন্ত্রী অবশ্য একই সাথে উল্লেখ করেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ভারতের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। এটি ভারতে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে জোরালো করার বিষয়ে আলোচনার একটি বড় সুযোগ তৈরি করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ডাচ প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্বেগকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (পশ্চিম) সচিব সিবি জর্জ প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, "আমরা মূলত এই ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হই কারণ প্রশ্নকর্তার কাছে তথ্যের অভাব থাকে।"
ভারতের ৫,০০০ বছরের পুরোনো সভ্যতার বৈচিত্র্য ও সহনশীলতার ইতিহাস তুলে ধরে সিবি জর্জ বলেন, "ভারত ১৪০ কোটি মানুষের দেশ, যা বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যা। এটি একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। বিশ্বে এমন আর কোনো দেশ নেই যেখানে চারটি ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ) উৎপত্তি হয়েছে। যিশু খ্রিস্টের পুনরুত্থানের পরপরই ভারতে খ্রিস্টধর্ম এসেছে এবং হজরত মুহাম্মদের সময়েই এখানে ইসলামের আগমন ঘটেছে ও বিকাশ হয়েছে।"
তিনি বলেন, "আমরা সম্প্রতি যে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি, সেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৯০ শতাংশ। এটাই ভারতের সৌন্দর্য। স্বাধীনতার সময় ভারতে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল ১১ শতাংশ, যা এখন ২০ শতাংশেরও বেশি। ভারত ছাড়া আর কোথাও এমন বৃদ্ধি দেখা যাবে না।"
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও 'রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস' (আরএসএফ)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো অবশ্য ডাচ প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আরএসএফ-এর ২০২৬ সালের বিশ্বব্যাপী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে দেখা গেছে, ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান আরও পিছিয়ে ১৫৭তম স্থানে নেমে এসেছে, যা ২০২৫ সালে ছিল ১৫১ এবং ২০২০ সালে ছিল ১৪২তম। চলতি বছরের সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিক থেকে ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
কূটনৈতিক এই বাদানুবাদ ও বিতর্ক সত্ত্বেও উভয় দেশই নরেন্দ্র মোদীর এই সফরকে 'ঐতিহাসিক' ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছে। সফরকালে ভারতের টাটা ইলেকট্রনিক্স বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ উৎপাদনকারী ডাচ সংস্থা 'এএসএমএল'-এর সঙ্গে গুজরাটে একটি চিপ উৎপাদন কারখানা তৈরির চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া, লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় ডাচ ঔপনিবেশিক আমলে ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া চোল রাজবংশের ঐতিহাসিক তাম্রশাসন বা রাজকীয় লিপি ভারতকে ফিরিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদীর এই সফরে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বড় সাফল্য এলেও, পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে ভারতের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর নজরদারির চাপ যে বাড়ছে, ডাচ প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য তারই বহিঃপ্রকাশ। নেদারল্যান্ডস সফর শেষে মোদী বর্তমানে সুইডেনে রয়েছেন, যেখানে তাকে দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান 'রয়্যাল অর্ডার অফ দ্য পোলার স্টার'-এ ভূষিত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
